Header Ads

মেজর এম এ জলিল : খেতাব বঞ্চিত একজন সেক্টর কমান্ডার

 

মেজর এম এ জলিল : খেতাব বঞ্চিত একজন সেক্টর কমান্ডার


সাধারণ কোন মুক্তিযোদ্ধা নয়, সদ্য স্বাধীন করা বাংলাদেশে প্রথম গুম এবং পরবর্তীতে রাজবন্দী হয়েছিলেন সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্য থেকে যারা দেশের জন্য লড়াই করতে চলে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম জেদি এবং সাহসী অফিসার ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধকালীন যেমন পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে আতঙ্কের কারণ হয়েছিলেন, তেমনি যুদ্ধোত্তর ভারতীয় লুটপাটকারী বাহিনীর কাছেও ত্রাসের প্রতীক ছিলেন এই নবম সেক্টর কমান্ডার।

মেজর এম এ জলিল ছিলেন এমন একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং স্বাধীনতার প্রকৃত আদর্শ বাস্তবায়নে তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। যে দেশের জন্য জীবন-যৌবন উপেক্ষা করে যুদ্ধ করেছিলেন, সেই স্বাধীন দেশে তাকে প্রথম রাজবন্দী হিসেবে আটক রাখা হয়। বঞ্চিত করা হয় তার প্রাপ্য খেতাব 'বীর উত্তম' থেকে।

মেজর জলিলের বিরুদ্ধে ভারত ও আওয়ামী চক্রান্ত

মেজর জলিল মুক্তিযুদ্ধের ৯ম সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন, যা বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট ও যশোরের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানি বাহিনী ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। ১৭ ডিসেম্বর খুলনা সার্কিট হাউসে পাকিস্তানি ৮,০০০ সৈন্য আত্মসমর্পণ করে।
এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মেজর জলিল ও তার সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা। তিনি চেয়েছিলেন, এ অঞ্চলের কমান্ডার হিসেবে পাকিস্তানি সৈন্যরা তার কাছে আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু ভারতীয় মিত্রবাহিনী এটি হতে দেয়নি। মেজর জলিল প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে জোর করে পেছনে ঠেলে দেওয়া হয়,এটা নিয়ে প্রতিবাদ করা হলে ভারতীয়রা তাকে একটি রুমে আবদ্ধ করে রাখেন।
৩১ ডিসেম্বর  লুটপাটকৃত কথিত মিত্রবাহিনীর গাড়িবহর আটকে দেন মেজর জলিলের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধারা। এর ফলে তাকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে শেখ মুজিবের সরাসরি নির্দেশে তাকে কোর্ট মার্শাল করা হয়। এই ঘটনা জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ এবং প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

তার আক্ষেপ : মুক্তিযুদ্ধ করা বড় ভুল ছিল

জাসদের কাছে ধরাশায়ী মুজিবের প্রথম ভোট ডাকাতি

১৯৭২ সালের ৭ জুলাই কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মেজর জলিল উপলব্ধি করেন, বাংলাদেশকে ভারতীয় আগ্রাসন ও শেখ মুজিবের অপশাসনের  হাত থেকে রক্ষা করতে হলে সর্বপ্রথম আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করতে হবে। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গঠন করেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)।
শেখ দুঃশাসন ও তার রক্ষীবাহিনীর অবর্ণনীয় নিপীড়নে অতিষ্ঠ মানের জন্য জাসদ শাপেবর হয়ে উঠেছিলেন।
মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে জাসদ জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছে যায় । ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে জাসদের জনপ্রিয়তা দেখে শেখ মুজিব কেঁপে উঠে।
ফলে প্রথম নির্বাচনে শেখ মুজিবকে অভিনব পদ্ধতিতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ভোট ডাকাতি করতে হয়। ইতিহাসে এই নির্বাচনটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ভোট ডাকাতির নজির হয়ে রয়েছে।

পড়ুন : জাতির ঘাতক শেখ মুজিব

জাতীয় চেতনায় মেজর জলিল

মেজর জলিল বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই রচনা করেছেন, যা দেশের স্বাধীনতার অনন্য প্রামাণ্য দলিল। তার আলোচিত গ্রন্থ "অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা" বইটি তার আদর্শ এবং দেশের স্বাধীনতার প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। বইটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করেছে। কীভাবে স্বাধীন বাংলাদেশে ভারতীয় শাসনের পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক ভণ্ডামি আমাদের স্বাধীনতাকে বিপন্ন করেছে, তা এতে উঠে এসেছে।
"রাজাকার ও মুক্তিযুদ্ধ " শব্দ দিয়ে জাতিকে বিভক্ত করার রহস্যও উন্মোচন করেছেন তিনি।

বিনামূল্যে পড়ুন : অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা

মেজর এম এ জলিলের ন্যায্য সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি

মেজর এম এ জলিলের মতো একজন সেক্টর কমান্ডারকে খেতাব বঞ্চিত রাখা শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি অবিচার নয়, বরং এটি সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অমর্যাদার শামিল। তার নেতৃত্বে নবম সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা দেশকে স্বাধীন করার জন্য লড়াই করেছিলেন। অথচ তার মতো একজন অকুতোভয় কমান্ডারকে বীরত্বসূচক খেতাব না দেওয়া একটি জাতির নৈতিক ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করে।
বর্তমান বিপ্লবী সরকারের প্রতি আহ্বান, মেজর এম এ জলিলের প্রতি জাতির এই ঋণ শোধ করা হোক। তাকে 'বীর উত্তম' খেতাব প্রদান করে জাতির পক্ষ থেকে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হোক। এটি কেবল তার প্রতি ন্যায্যতার প্রশ্ন নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি জাতির দায়বদ্ধতাও।
মেজর এম এ জলিলের ন্যায্য সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া মানে তার আদর্শ, ত্যাগ এবং দেশপ্রেমকে চিরকালীন প্রেরণা হিসেবে বাঁচিয়ে রাখা। জাতি তার এই মহৎ অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে পারে, যদি তাকে তার প্রাপ্য স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।

No comments

Powered by Blogger.