জাতীয় রক্ষীবাহিনী: হিটলারের নাৎসি বাহিনীর আদলে গড়ে তোলা শেখ মুজিবের প্রাইভেট সন্ত্রাসী বাহিনী
জাতীয় রক্ষীবাহিনী: হিটলারের নাৎসি বাহিনীর আদলে গড়ে তোলা শেখ মুজিবের প্রাইভেট সন্ত্রাসী বাহিনী
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে নেতৃত্ব দেয়া শেখ মুজিব চাইলে হতে পারতেন কালের মহানায়ক।
আশাহীন, ভাষাহীন, দিশাহীন এবং বিধ্বস্ত জাতি ও দেশকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনে নিয়ে যেতে পারতেন।
কিন্তু মুজিব তা করেননি। বরং জাতিকে গণহত্যার মুখে ফেলে দিয়ে তিনি পাকিস্তানিদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন, নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পাড়ি দিয়েছিলেন পাকিস্তান।
তবুও সহজ-সরল জাতি তাকে গ্রহণ করেছিলেন, বসিয়েছিলেন সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে।
তারপরও তিনি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে ঐক্যবদ্ধ করে গড়ার পরিবর্তে বিভক্তির দিকে টেনে নিয়ে গেছিলেন।
রনাঙ্গনে নেতৃত্ব দেয়া তাজউদ্দীন আহমেদ সরিয়ে শেখ মুজিব যেদিন প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছিলেন, সেদিনই বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের গোড়াপত্তন হয়েছে। মুজিব কেবল ফ্যাসিবাদের জনক ছিলেন না; একাধারে ভোট ডাকাতি, খুন, গুমের সূচনা এবং লুটপাটের নেতৃত্ব দেয়াসহ সদ্য স্বাধীন হওয়া বিধ্বস্ত দেশের অন্যায়-অবিচারের গোড়াপত্তনকারী ছিলেন।
যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের অপুষ্ট, অভুক্ত মানুষের উপর শেখ মুজিব কর্তৃক লেলিয়ে দেওয়া বাহিনীর অবর্ণনীয় তাণ্ডব ডেকে এনেছিল ১৫ই আগস্ট।
দেশের মানুষ সরলমনে যাকে নেতা বানালেন, অচিরেই তিনি সে মানুষগুলোর গলা চেপে ধরলেন। তাদের দমন করার জন্য গঠন করলেন সেনাবাহিনীর সমান্তরাল আরেকটি বাহিনী—জাতীয় রক্ষী বাহিনী।
রক্ষী বাহিনীর গঠন ও পরিচালনার পদ্ধতি
১৯৭২ সালের ৭ই মার্চ জাতীয় রক্ষী বাহিনী আদেশ প্রণয়ন করা হলেও স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে ইন্ডিয়া প্রবাসী সরকারকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে, স্বাধীনতার পর দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হবে। তাই আধা-সামরিক বাহিনীর আদলে পুরোদস্তুর সামরিক কায়দায় রক্ষীবাহিনীর চিন্তা ঢুকিয়ে দেয়।
রক্ষী বাহিনী প্রণয়ন, প্রশিক্ষণ এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার কাজ করেছিল ভারত। ভারতের দেরাদুনে নিয়ে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে সদস্য করা হতো। প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় সামরিক অফিসার জেনারেল উবান।
রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টার করা হয় ঢাকার সাভারে। তার দায়িত্বে রাখা হয় আরেক ভারতীয় অফিসার মেজর রেড্ডিকে।
যেদিন ভারতীয় সৈন্যরা বাংলাদেশ ত্যাগ করে, সেদিন থেকেই সারা দেশে রক্ষীবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
রক্ষীবাহিনীর জন্য উন্নত অস্ত্র, সরঞ্জাম, কাপড়, রেশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ব্যবস্থা করা হলেও সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিডিআরের জন্য কোনো বরাদ্দ ছিল না বললেই চলে।
রক্ষীবাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ রাখা হয় প্রধানমন্ত্রী তথা মুজিবের হাতে। এ বাহিনীর কোনো জবাবদিহিতাও ছিল না।
রক্ষীবাহিনীর বর্বরতা: ছাড়িয়ে গিয়েছিল পাকহানাদার বাহিনীকেও
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত রক্ষীবাহিনী যে নৃশংসতা চালিয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায় হয়ে আছে।
রক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিধানের কথা বলা হলেও এই বাহিনীর কাজ ছিল শেখ মুজিবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখা এবং ভিন্নমতকে কঠোরভাবে দমন করা।
এ ছাড়াও ভারতের স্বার্থ নিশ্চিত করা এবং দেশের সেনাবাহিনীকে চাপের মুখে রাখা ছিল তাদের উদ্দেশ্য।
(যদিও শেখ মুজিবকে বাঁচানো দূরের কথা, ১৫ই আগস্ট ভোরে কর্নেল ফারুকের গোলাবারুদহীন খালি ট্যাংক দেখে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে রক্ষীবাহিনীর ৩০ হাজার সদস্য সেনাবাহিনীর একজন মেজর ও কয়েকজন সিপাইয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।)
রক্ষী বাহিনীর বর্বরতা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এ বাহিনীর হাতে ২৭ হাজার (মতান্তরে ৪০ হাজার) মানুষ নির্বিচারে মারা গিয়েছিল। তাদের হাতে বন্দী থাকা অবস্থায় মারা যায় আরও ৯ হাজার বন্দী।
গুম ও নির্যাতনের শিকার হওয়া মানুষের সঠিক পরিসংখ্যান আজও কারো কাছে নেই। বলাবাহুল্য, ভুক্তভোগী অধিকাংশ মানুষ ছিলেন জাসদ ও সর্বহারা দলের কর্মী-সমর্থক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফেরি করে বেড়ানো আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধা ধরে জীবন্ত কবর দেয়ার ভয়াবহ ঘটনাও ঘটিয়েছে।
বর্বরতার কিছু উদাহরণ
বাজিতপুরের কৃষক আবদুল আলীর বক্তব্য
“আমি ও আমার ছেলে রশিদকে বেঁধে প্রচণ্ড মারল। পরে আমার সামনে তাকে গুলি করল। আমার চোখের সামনে ঢলে পড়ল বাপ আমার। তারপর এক কসাই আমাকে কুঠার দিয়ে বলল, 'তোর ছেলের মাথা দিয়ে ফুটবল খেলব, নিজের হাতে কেটে দে তার মাথা।' আমি কি তা পারি? আমি যে তার বাপ!
তারপর আমাকে টানা দেড় ঘণ্টা মারার পর আর সহ্য করতে পারলাম না। নিজের হাতে নিজের ছেলের মাথা কেটে দুভাগ করে দিলাম। এভাবে আমার নিজের হাতে ছেলের মাথা কেটে ফেলতে হলো। আল্লাহ কি এই পাপ মাফ করবেন? বলেন বাব!”
বামপন্থী নেতা শান্তি সেনের অভিজ্ঞতা
শান্তি সেন রক্ষীবাহিনীর নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেন:
“রক্ষীবাহিনী বিপ্লবকে মারধর করে তার মা-বাবার সামনে নিয়ে আসে। তাকে কালিমা পড়তে বাধ্য করা হয়। তারপর বলা হয় পশ্চিমমুখী হয়ে সিজদা দিতে। যখন সে সিজদা দেয়, তখন রক্ষীবাহিনীর এক সদস্য বলল, 'মুসলিম যখন হয়েছিস, এবার বেহেশতে চলে যা।' বলে পেছনে বেয়নেট চার্জ করে শত শত গ্রামবাসীর সামনে তাকে হত্যা করে।”
শ
ময়মনসিংহ গণহত্যা: কিশোর-তরুণদের হত্যা
১৯৭৩ সালের ৩১ জানুয়ারি ময়মনসিংহে জাসদ-সর্বহারার সমর্থনে যুক্ত থাকার অভিযোগে ১,৫০০ কিশোর-তরুণকে হত্যা করা হয়।
অগণিত ৩৩শশ৩৩ যুবক নিখোঁজ হয়, যার সঠিক পরিসংখ্যান আজও কারো কাছে নেই।
শেখ মুজিবের পতন।
৭২ থেকে ৭৫ শাসনামতল পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এমন কোন রাত ছিল না, যে রাতে শেখ মুজিবের বাহিনী ঝাপিয়ে পড়েনি কোন গ্রাম বা কলোনীর উপর, মানুষ থাকত তটস্থ, উদ্বেগ উৎকন্ঠায়,মসজিদে মন্দির নীরবে প্রার্থনা করা হত "ফেরাউনের শাাসন" অবসানের জন্য, ফলে অনিবার্য পরিনতি হিসাবে ১৫ ই আগস্ট আসে।
মুজিব হত্যায় সারাদেশের মানুষ আনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়ছিল,শহর নগর গ্রামের কোন দোকানে মিষ্টি ছিল না, শেখ পরিবারের লাশ ছুয়ে দেখা ও জানাজা পড়ার লোকও পাওয়া যায়নি।
"লাল ঘোড়া দাবড়ায়া দেব"
" নকশাল দেখলে গুলি কর"
" কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?"
শেখ মুজিবের এহেন দম্ভোক্তির পর তার খুনি বাহিনী গুলোর জন্য আর কোন আইন ও বাধা কার্যকর ছিল না, জাতির উপর একচ্ছত্র নৃশংসতার জন্য শেখ পরিবারকে করুন পরিণতি ভোগ করতে হয়েছিল, তার নিরাপত্তা বিধানে ব্যার্থ রক্ষিবাহিনী,লাল বাহিনী,নীল বাহিনী,মুজিববাহিনীর সকল কাঠামো ভেঙে পড়েছিল তুরুপের তাসের মত।
ইতিহাসের উপাদান ও রেফারেন্স
আহমেদ মুসা, "ইতিহাসের কাঠগড়ায় আওয়ামী লীগ"
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, "আওয়ামী শাসনকাল"
হায়দার আকবর খান রনো, "বাম রাজনীতি: সংকট ও সমাধান"
মাওলানা ভাসানী প্রকাশিত "সাপ্তাহিক হলিডে" (১৯৭১-১৯৭৫) সংখ্যাগুলো
১৯৭২-১৯৭৫ সালের দৈনিক পত্রিকা
No comments