শীতকাল: রিক্ততার ঋতু থেকে ঐশ্বর্যের রূপে
![]() |
| ছবি Ai |
শীতকাল: রিক্ততার ঋতু থেকে ঐশ্বর্যের রূপে
বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, শীতকাল জুড়ে থাকে পৌষ ও মাঘ মাস। শীতের সকালে বাংলার প্রকৃতি মেলে ধরে তার নান্দনিক সৌন্দর্য। সবুজ ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির বিন্দু, কুয়াশার চাদর সরিয়ে সোনালি রোদে ঝিলমিল করা দৃশ্য—সবকিছু যেন প্রকৃতির এক বিশেষ আয়োজন। মৌমাছিরা মধু সংগ্রহের জন্য ছুটে বেড়ায়, আর কৃষকরা ব্যস্ত থাকে সবজি ও ফসলের ক্ষেতে। শীতের সকালে গ্রামীণ জীবন যেন হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। খেজুরের রস থেকে তৈরি হয় পায়েস ও গুড়, আর বাড়ির বধূরা ব্যস্ত থাকেন নানা ধরনের পিঠা তৈরিতে।
গ্রাম ও শহরের শীতের পার্থক্য
গ্রামের শীতের সকাল শহরের তুলনায় অনেক বেশি মনোরম। আগুন জ্বালিয়ে শীত পোহানো, পিঠার স্বাদ নেওয়া—এ সবই যেন শীতকালীন ঐতিহ্যের অংশ। শহরের শীতের সকাল যতটা ব্যস্ত, গ্রামের সকাল ততটাই শান্তিপূর্ণ এবং প্রাণবন্ত। গ্রামীণ ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেয় আহসান হাবীবের পংক্তি:
“শীতের পিঠা, শীতের পিঠা, ঝাল নোনতা বেজায় মিঠা,
পাটি সাপটা, চিতই ভাপা, মালাই ঠাসা কিংবা ফাঁপা।”
শীতের নির্মম বাস্তবতা
তবে শীত সবার জন্য আনন্দদায়ক নয়। দরিদ্র মানুষের জন্য শীতকাল অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। গরম কাপড়ের অভাব, মাথার ওপর ছাদের অভাব—এসব চরম বাস্তবতা তাদের জীবনে দুঃখের ছাপ ফেলে। খড়কুটা জ্বালিয়ে ঠান্ডা মোকাবিলা করা, রাতভর সূর্যের অপেক্ষায় থাকা, আর দাঁতে দাঁত চেপে শীত কাটানোই তাদের নিত্যসঙ্গী। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তাদের এই কষ্টকে চিত্রায়িত করেছেন অসাধারণভাবে:
“হে সূর্য, তুমি তো জানো, আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব।”
![]() |
| ছবি Ai |
শীতের কৃষি ও প্রকৃতির সৌন্দর্য
অন্যদিকে, কৃষকের কাছে শীতের ঋতু আনন্দের। শীতকালে শাক-সবজির ফলন বাড়ে। হলুদ শর্ষে ফুলে মাঠের সৌন্দর্য যেন অনন্য। সুদূর সাইবেরিয়া থেকে আসা অতিথি পাখিরা বাংলার প্রকৃতিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। শীতের শেষে প্রকৃতি আবার নতুন রূপে সেজে ওঠে, যেন এক নতুন ঋতুর আগমনী বার্তা।
শীতকাল তার দ্বৈত রূপে আসে—কখনো রিক্ততার প্রতীক, কখনো ঐশ্বর্যের বাহক। এটি যেমন প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ করে, তেমনি মানব জীবনের কঠিন বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়। এই বৈচিত্র্যময় ঋতু আমাদের শেখায় সহমর্মিতা, উদ্যম, এবং জীবনের রূপময়তা উপভোগ করার শিল্প।


No comments