Header Ads

বড়াইবাড়ি যুদ্ধ: সৈন্যদের লাশ রেখে পালিয়েছিল ভারত

 

প্রতিকী ছবি


বড়াইবাড়ি যুদ্ধের পটভুমি,

সিলেটের গোয়াইনঘাটের পাদুয়া গ্রাম ছিল এই উত্তেজনার মূল কেন্দ্র। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এ স্থানটি মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হলেও পরবর্তীতে বিএসএফ তা বেআইনিভাবে দখল করে নেয়। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। ২০০১ সালের ১৫ এপ্রিল বিডিআর (আজকের বিজিবি)  পাদুয়া পুনরুদ্ধার করে তিনটি ক্যাম্প স্থাপন করে। এর প্রতিশোধ নিতে বিএসএফ ১৮ এপ্রিল কুড়িগ্রামের বড়াইবাড়ি এলাকায় পরিকল্পিত আক্রমণ চালায়।

পাদুয়া ঘটনার প্রতিশোধ পরিকল্পনা


ভারতীয় বর্ডার গার্ড বিএসএফ ২০০১ সালের ১৬ এপ্রিল পাদুয়া সংঘর্ষের প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে বড়াইবাড়ি অপারেশনের পরিকল্পনা করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বড়াইবাড়ি, হিজলামারী, এবং খেওয়ারচর এলাকার বিডিআর ক্যাম্পগুলোকে দখল করে বাংলাদেশের ৪ কিলোমিটার উর্বর জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা এবং মহেন্দ্রগঞ্জ-কামালপুর পাকা সড়কের নির্মাণ কাজ নির্বিঘ্ন করা।
বিএসএফ মাইনকারচর এলাকায় রাতের আঁধারে গোপনে তিন প্লাটুন ক্যাটস আই কমান্ডো এবং দুই শতাধিক অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করে। এ সময় তারা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, মর্টার, কামান, মেশিনগান, সাঁজোয়া যানসহ প্রস্তুত ছিল।
অন্যদিকে বিডিআর হাতে তেমন কোন কিছু ছিল না, মাত্র ৮ জন বিডিআর সদস্য 
বাংলাদেশ সীমান্তে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার বা উন্নত নজরদারির অভাব থাকায় এই পরিকল্পনার খবর বিডিআর-এর কাছে পৌঁছায়নি। তবে ১৬ এপ্রিল বিকালে বিএসএফ বড়াইবাড়ি বিডিআর ফাঁড়িতে একটি ফ্ল্যাগ মিটিং-এর প্রস্তাব পাঠায়।

ষড়যন্ত্রমূলক ফ্ল্যাগ মিটিং প্রস্তাব


বিএসএফ চিঠির মাধ্যমে ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের প্রস্তাব দেয়, যদিও সীমান্তে তখন কোনো অঘটন ঘটেনি। বিডিআর ক্যাম্পের কমান্ডার নজরুল ইসলাম চিঠিটির সন্দেহজনক প্রকৃতির কারণে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তার ধারণা ছিল, ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের নামে কিছু বিডিআর সদস্যকে ভারতের অভ্যন্তরে ডেকে নিয়ে আটকে রেখে ক্যাম্পে আক্রমণ চালানো হতে পারে। এই সন্দেহের কারণে নজরুল ইসলাম তার ক্যাম্পকে সতর্ক অবস্থায় রাখেন এবং ১০ জন সদস্যকে সারারাত সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন।


অপারেশনের শুরু

প্রতিকী ছবি


প্রথম আক্রমণ

১৮ এপ্রিল রাত ৩টার দিকে ভারতীয় বাহিনী বড়াইবাড়ি ক্যাম্পের সীমানায় প্রবেশ করে। তারা শুকিয়ে যাওয়া একটি খালের মাধ্যমে বড়াইবাড়ি ক্যাম্পে ঢোকে। ধানক্ষেতে কাজ করতে গিয়ে গ্রামের মিনহাজ নামের একজন বিএসএফ-এর আগমন টের পেয়ে দ্রুত বিডিআর ক্যাম্পে খবর দেয়।

প্রতিরোধ গড়ে তোলা


এমন সময় ১০ বিডিআর সদস্য নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতা মূলক অবস্থান নেয় এবং পার্শ্ববর্তী ক্যাম্পে খবর পাঠায়,

ভোর ৪টা ৩০ মিনিটে বিএসএফ পূর্ব দিক থেকে বড়াইবাড়ি ক্যাম্পে গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রথম ১০ মিনিট বিডিআর প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চুপচাপ থাকে,ফলে বিএসএফ মনে করছিল বিডিআর পালিয়ে গেছে, পরে চারটি মেশিনগান দিয়ে বিডিআর ৪ জন জাওয়ান একযোগে আক্রমণ চালায়। এই আকস্মিক আক্রমণে ভারতীয় বাহিনী হতচকিত হয়ে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

ভারতীয় সৈন্য বাহিনী মনে করছিল অসংখ্য বিডিআর সদস্য চারিদিকে ঘিরে ফেলছে এবং পরিকল্পিত আক্রমনের প্রতিহতের জন্য সকল প্রস্ততি নিয়ে রেখেছে।

বস্তত সতর্ক পাহারা ছাড়া কোন প্রস্ততিই বিডিআরের ছিল না।

বিডিআর সদস্যরা পশ্চিম দিক থেকেও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পার্শ্ববর্তী হিজলামারী এবং খেওয়ারচর ক্যাম্প থেকেও অতিরিক্ত বিডিআর সদস্য এসে বড়াইবাড়ি ক্যাম্পে যোগ দেয়।



ভারতীয় বাহিনীর পরাজয়

সকাল ১০টা পর্যন্ত মাত্র  ১০ জন বিডিআর সদস্য গেরিলা পদ্ধতিতে প্রবল সাহসে ৬০০ শত ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে, সকাল ১০টায় পার্শ্ববর্তী ক্যাম্প থেকে ৩৩ রাইফেল ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত বিডিআর সদস্যদের উপস্থিতি এবং বিডিআর-এর পাল্টা আক্রমণে ভারতীয় বাহিনী তার সৈন্যদের লাশ রেখে পালিয়ে যায়।

এই সংঘর্ষে:

  • ১৬ জন বিএসএফ সদস্য নিহত হয়।
  • ২ জন বিডিআর সদস্য (মাহফুজার রহমান ও আঃ কাদের) শহীদ হন।
  • গ্রামবাসীর মধ্যে ৫ জন আহত হন।
  • ১৬ জন বিএসএফ সদস্যের লাশ উদ্ধার করে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতে হস্তান্তর করা হয়।

বিডিআর উদ্ধার করে:

  • ২টি এলএমজি।
  • ১৫টি এসএলআর।
  • বিপুল পরিমাণ গুলি, ম্যাগাজিন, জুতা এবং অন্যান্য সরঞ্জাম।

মানুষের দুর্ভোগ,


সংঘর্ষের কারণে সীমান্তের আশপাশের প্রায় ৩০টি গ্রামের ৩৫ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়।


শেষ পরিণতি

উভয় পক্ষের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা এবং ফ্ল্যাগ মিটিং-এর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। উত্তেজনা প্রশমিত হলেও তৎকালীন দিল্লিদাসী শেখ হাসিনা বিডিআর জাওয়ানদের এই অসীম সাহসিকতার পুরস্কার দেয়ার পরিবর্তে শাস্তিমূলক বদলী ও চাকুরীচ্যুত করেছিলেন।

বলা হয় এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই ভারত শেখ হাসিনার সহায়তায় পিলখানা হত্যাকান্ড ঘটায়


প্রতিকী ছবি

বড়াইবাড়ি অপারেশন আমাদের শিখিয়েছে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সতর্কতা ও সাহসিকতার প্রয়োজনীয়তা। এটি প্রমাণ করে, সীমান্ত রক্ষীরা কেবল প্রতিরক্ষার অংশ নয়, তারা দেশের স্বাধীনতা ও মর্যাদার একনিষ্ঠ প্রহরী।

এই অপারেশন কেবলমাত্র বিডিআর-এর বীরত্ব নয়, বরং পুরো জাতির জন্য একটি অনুপ্রেরণা এবং গৌরবের প্রতীক।

No comments

Powered by Blogger.