Header Ads

স্বৈরাচারের দোসরদের বহাল রেখে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন সফল হবে না

 

স্বৈরাচারের দোসরদের বহাল রেখে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন সফল হবে না

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের দুই সপ্তাহ অতিবাহিত হওয়ার পর গত রোববার জাতির উদ্দেশ্যে প্রথম ভাষণ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর এই ভাষণে স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর নতুন বাংলাদেশ গঠনের দিকনির্দেশনা ও কর্মপরিকল্পনা উঠে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা এ ভাষণকে গঠনমূলক আখ্যায়িত করে সতর্ক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তবে বেশিরভাগ পর্যবেক্ষকই মনে করছেন, তাঁর কর্মপ্রক্রিয়া ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন যে প্রশাসন যন্ত্র করবে, তা স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার গড়ে তোলা। প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুসহ সর্বত্র তার দোসররা রয়ে গেছে। এদের দিয়ে প্রধান উপদেষ্টার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হবে না। প্রায় সব মন্ত্রণালয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের নিয়োগকৃত সচিব এবং বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা রয়ে গেছে। তাদের বহালতবিয়তে রেখে ছাত্র-জনতার নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন কোনোদিনই সফল হবে না। পদে পদে তারা অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করবে। অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে কিছু পরিবর্তন করেছে। তবে এ পরিবর্তন বেশিরভাগই বদলির মধ্যে সীমাবদ্ধ। ‘এধারকা মাল ওধার, ওধারকা মাল এদারের মতো’ এক মন্ত্রণালয় থেকে আরেক মন্ত্রণালয়ে বদলি করেছে। এসব সচিব ও কর্মকর্তা যেখানেই থাকুক না কেন, তারা স্বৈরাচারী শেখ হাসিনারই লোক। তারা সেখান থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং তার সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ করবে।

গতকাল দৈনিক ইনকিলাবে বেশ কয়েকটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, সিভিল প্রশাসন, আদলত, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসার, দুর্নীতি দমন কমিশন, থেকে শুরু করে সর্বত্র বিগত স্বৈরাচার সরকারের অনুগত আমলা ও কর্মকর্তাদের বহাল থাকা এবং তারা যে নানাভাবে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিপাকে ফেলার ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে, তার আভাস দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বিগত স্বৈরাচার সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের দিয়ে দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। তাদের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক তথ্য ইতোমধ্যে পাচার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে চলে গেলেও তার সাজিয়ে রাখা কর্মকর্তারা প্রশাসনে ঠিকই রয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা দাবি-দাওয়ার নামে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে মাঠে নামিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল ও কাজ করতে না দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে। ফ্যাসিবাদের এই দোসররা যদি সব জায়গায় থেকে যায়, তাহলে ছাত্র-জনতার স্বপ্নের বাংলাদেশ কিভাবে গড়ে তোলা হবে? বলার অপেক্ষা রাখে না, ছত্র-জনতা যখন জীবন দিয়ে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনাকে হটানোর আন্দোলন করছে, তখনও এই প্রশাসন এবং তার সচিব ও কর্মকর্তারা ছিল। তারা আন্দোলন দমাতে ভূমিকা রেখেছিল। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফসল অন্তর্বর্তী সরকারই যদি সেই একই প্রশাসন দিয়ে রাষ্ট্র চালায়, তাহলে সংস্কার হবে কিভাবে? স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার লোকজন কি তা হতে দেবে? পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদ দায়িত্ব নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশাসনযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকাদের দ্রুত অপসারণ করা উচিৎ ছিল। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা লতিফুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের একঘন্টার মধ্যেই প্রায় ১৩ গুরুত্বপূর্ণ সচিবকে অপসারণ করেছিলেন। নির্বাচন কমিশনে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন। প্রশাসনকে সে সময়ের আওয়ামী সরকারের দোসরদের উচ্ছেদ করে নিরপেক্ষ করেছিলেন। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ তিন সপ্তাহ হয়ে গেলেও ফ্যাসিবাদের দোসর আমলা ও কর্মকর্তাদের প্রশাসন থেকে বিতাড়িত করেনি। উপদেষ্টাদের কেউ কেউ যে দুর্নীতি দমন কমিশনের ভিত্তিহীন মামলার শিকার হয়েছিলেন, সেই দুর্নীতি দমন কমিশনে ফ্যাসিবাদের দোসররা এখনও বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা যে পুলিশকে কিলিং মেশিনে পরিণত করেছিল, সেখানেও একই অবস্থা বিরাজমান। দায়িত্বে থাকা ওসিদের কেবল এক থানা থেকে আরেক থানায় বদলি করা হয়েছে এবং হচ্ছে। এতে কি কোন লাভ হচ্ছে? পুলিশে সংস্কার হচ্ছে? হচ্ছে না। বরং ফ্যাসিবাদের দোসর এই ওসিরা যেখানেই যাবে, সেখানেই কোনো না কোনো অন্তর্ঘাতমূলক অপকর্ম করে অন্তর্বর্তী সরকারকে যে বিপাকে ফেলবে, তাতে সন্দেহ নেই। সর্বশেষ আনসারদের দিয়ে যে ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনা ঘটানো হয়েছে, তার মধ্যেই অশনি সংকেত রয়েছে। আনসার বাহিনীতে যে রদবদল করা হয়েছে, তা স্বৈরাচারের নিয়োগকৃতদের মধ্যেই হয়েছে। তাদের অপসারণ করা হয়নি। বহাল তবিয়তে থাকা ফ্যাসিস্ট সরকারের পুলিশ কর্মকর্তারা যে এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে না, তার নিশ্চয়তা কি? নি¤œ আদালতগুলোতেও ফ্যাসিবাদের দোসররা বসে আছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে স্বৈরাচারের নিয়োগ করা সচিব ও কর্মকর্তারা বসে আছে। যে নির্বাচন কমিশন বিনাভোটের নির্বাচন করেছে এবং চরম দুর্নীতিতে জড়িয়েছে, সে নির্বাচন কমিশনও বহাল রয়ে গেছে। পরিবহন খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাওয়া রেল মন্ত্রণালয়ে লুটপাটের ঘটনা নিত্যকার বিষয়। এ মন্ত্রণালয়ে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারে নিয়োগকৃত কর্মকর্তারা শত শত কোটি টাকা লুটপাট করেছে। রেলকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছে। সেখানেও তারা আরামে বসে আছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রশাসন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল অর্গান থেকে ফ্যাসিবাদের দোসরদের দ্রুত অপসারণ করবে বলে দেশের মানুষ যে আশা করেছে, সে আশা পূরণ হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার করব, করছির মধ্যে রয়ে গেছে।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণে সুমিষ্ট ও সুললিত কথা ও পরিকল্পনা থাকলেও তা ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসরদের দিয়ে কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে গভীর সংশয় ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের তৈরি করা প্রশাসন নামক ডিনামাইটের উপর বসে আছে। ফ্যাসিবাদের দোসরদের দিয়ে তৈরি এই প্রশাসন অক্ষত রাখলে যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ফলে প্রধান উপদেষ্টার মিষ্টি কথা দিয়ে কোনো কাজ হবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং তাঁর প্রতি জনগণের যে আকাক্সক্ষা, তা স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার দোসরদের বহাল রেখে বাস্তবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অন্তর্বর্তী সরকারকে জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলো সময় দেয়া এবং সহযোগিতার কথা বললেও সিভিল প্রশাসনসহ সব অর্গানে ফ্যাসিবাদের দোসরদের দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার কোনোদিনই হবে না। পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসররা প্রধান উপদেষ্টার কর্ম ও পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করবে, এ আশা দুরাশা ছাড়া কিছু নয়। অন্তর্বর্তী সরকারকে যেখানে স্বৈরাচারের প্রশাসনকে সমূলে উৎপাটনে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া জরুরি, সেখানে তাকে কচ্ছপ গতিতে চলতে দেখা যাচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে, স্বৈরাচার সরকারের দোসরদের গুছিয়ে উঠতে সময় দেয়া। এটা ছাত্র-জনতার আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। অন্তর্বর্তী সরকারকে অবিলম্বে সিভিল প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসার, দুর্নীতি দমন কমিশন, আদালতসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল স্তর থেকে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের লোকজনকে দ্রুত অপসারণ ও মূলোৎপাটন করতে হবে। তাদের অপসারণ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার কোনোভাবেই কাজ করতে পারবে না এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নও বাস্তবায়িত হবে না।


No comments

Powered by Blogger.