রাজবন বিহার; শুধু দর্শনীয় স্থান নয়, ধর্ম ও দর্শনের তীর্থ ভূমি।
![]() |
| রাজবন বিহারে সংরক্ষিত মমি |
রাজবন বিহার;
শুধু দর্শনীয় স্থান নয়, ধর্ম ও দর্শনের তীর্থ ভূমি।
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান রাজবন বিহারের প্রতিষ্টাতা সাধনানন্দ মহাস্থবির,যিনি বনভান্ত নামেই পরিচিত।
তাঁর জন্ম ১৯২০ সালের ০৮ জানুয়ারি।
বুদ্ধের বাণী এবং তার দর্শনের স্থায়িত্ব,বিলুপ্তি ও বিকৃতি থেকে সুরক্ষা এবং প্রচার ও প্রসার নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে বনভান্তে নিমগ্ন সাধক; একাধারে তিনি জ্ঞানসাধক, অরণ্যচারি,সমাজ-সংস্কারক ও সত্যসন্ধানি।
হিংসা-শত্রুভাবাপন্নতা-লোভকে পরিত্যাগ করে, এমনকি,সর্বোপরি প্রায় সকলের আরাধ্য, জাগতিক সংসারসমুদ্র (পারিবারিক সহজ কাঠামো অর্থে) ত্যাগ করে তিনি আধ্যাত্মচিন্তায় নিবিষ্ট হয়েছিলেন। প্রায় ৬০ বছরের অধ্যয়ন বিশেষত বিভিন্ন ধর্মের গ্রন্থ ও বাণী পাঠ, সাধনা আর পদ্ধতি আচারের মধ্য দিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন অনুকরণীয় পথরেখা। জাতি ও ধর্মগত ভেদাভেদের স্বীয় অবস্থানস্থল নিশ্চিত করে, সকল সংকীর্ণতার সামাজিক বাধ্যবাধকতা অতিক্রম করে, আপন ভুবন নির্মাণ করতে সমর্থ হয়েছেন এই মহান ঋষি।
ব্যক্তিগত সংযম প্রতিষ্ঠা আর পারিবারিক বিবাদসমূহকে দূর করে শান্তির সুবাতাস নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে তিনি বয়ে বেড়িয়েছেন ধর্মের বার্তা।
তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, সত্যকে জানা, নীতিতে আস্থা প্রতিষ্ঠা করা,সাধারণের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনন্যসাধারণ হয়ে ওঠার মধ্যে স্বাধীনতার স্বাদ লাভ করা যায়; আর এই স্বাধীনতার অনুভবই ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীকে পৌঁছে দিতে পারে পরম প্রত্যাশিত নির্বাণের উদার ও অপরিসীম প্রান্তরে।
আর জ্ঞানী ও সত্য-সন্ধানীর সাথে ধর্ম নিয়ে প্রতারণা করতে পারে না ধান্দাবাজ মানুষ কিংবা কোনো অশুভ শক্তি।
মদ-জুয়ায় আসক্তি কিংবা আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর প্রবণতা থেকে মানবজাতিকে নিরাপদ-দূরত্বে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। চিন্তাপ্রচারক ও ধর্ম-দার্শনিক সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তের বাণী শুনবার জন্য হাজার হাজার মানুষ একটি বিশেষ দিনে রাঙামাটির রাজবাড়ির কোল ঘেঁষা বিহারের স্থির চত্তরে সমবেত হতেন।
পাহাড়ী বাঙালি সকলের মাঝে নিরবিচ্ছিন্ন শ্রদ্ধা ও ভক্তির অধিকারী হয়েছিলেন।
বনভন্তের কথা শুনবার জন্য, তাঁকে একনজর দেখবার জন্য, তাঁর অনুসরণীয় পধ ধরে জীবনের বাকি সময়টা পার করবার প্রত্যয় ধারণের জন্য পার্বত্য তিনজেলাসহ সারাদেশের (বহির্দেশেরও বটে) অগণন মানুষের উপচে পড়া ভিড় মনে করিয়ে দেয় যে, ধর্মের পথ থেকে লোকেরা সত্যি সত্যি বিচ্যুত হয়নি।
তার মৃত্যুর পর তার অনুসারীদের তার নির্দেশিত পথে চলার সকল প্রচেষ্টা থেকে প্রতিয়মান হয় যে, খ্যাতিমান এই মনিষীর মিশন বিফল ছিল না।
দেশের গন্ডি পেরিয়ে সারা বিশ্বের মাঝে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছিলেন বনভান্তে, অর্জন করেছেন খ্যাতি ও প্রশংসা, সম্মানিত হয়েছিলেন অনন্য ধর্মাবলম্বীদের মাঝেও,
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা,বিভিন্ন মেয়াদে রাস্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শীর্ষ নেতৃত্ববৃন্দ, দেশের সীমানা পেরিয়ে ভারত,মায়ানমার, শ্রীলংকা,জাপান, নেপালসহ অনেকদেশের রাস্ট্রপ্রধান; তাদের প্রেরিতদূতবর্গ এসে তার থেকে আশির্বাদ; পরামর্শ নিতেন,
সারাদেশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মাঝে অদ্বিতী ছিলেন।
তার শান্তির বানী,ধর্মীয় প্রজ্ঞা,চিন্তা ও দর্শন ছড়িয়ে পড়েছে দেশান্তরে,সংক্রমিত হয়েছে প্রজন্মান্তরে।
বৌদ্ধ ধর্মের ধর্মীয় উৎসব "কঠিন চিবরদান" প্রবর্তন তিনি করেন।
সারাদেশে আশ্রম প্রতিষ্টা,শান্তির বাতাস ছড়িয়ে দিতে শহর নগর,বন বাদড়,গহীন সর্বত্র সংগ্রাম করেছেন।
২০১২ সালে মৃত্যুর পর বনভান্তের মৃতদেহ মমি করে রাখা হয়েছে। প্রতিদিন দেশ বিদেশের হাজারো মানুষ দর্শন করতে আসেন এ মহামানবকে। তাকে দৃষ্টি থেকে দূরে সরাতে চায়নি ভক্তরা। মৃত মানুষকে সংরক্ষিত করে রাখার জন্য থাইল্যান্ডের আধুনিক প্রযুক্তিতে মমি করে রাখা হয়েছে বনভান্তকে। ঝিনুক বসিয়ে নকশা করা ফ্রেমের একটি কফিনে কাচের ভেতরে শুয়ে রয়েছেন বনভান্তে। এ প্রযুক্তিতে ৫০ বছর পর্যন্ত বনভান্তেকে একই অবস্থায় রাখা যাবে বলে জানা যায়।
তারপাশে শুয়ে আছে আরেকটা মমি, রাজবন বিহারের উপসাসক-উপসাসিকা পরিষদের সভাপতি গৌতম দেওয়ান বুদ্ধের লাশও মমি করে সংরক্ষণ করা হয়েছে
মমির পূর্ব দিকে বেশ বড় যে সোফা সেখানে যেন ধ্যানমগ্ন হয়ে বাম কাঁধে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে আছেন বনভান্তে।
প্রথম দর্শনে যে কেউ সত্যি ভেবে বিভ্রান্ত হয়ে যায়, হুবহু নিখুঁত মুর্তি এভাবে বানানো অবিশ্বাস্য লাগতে পারলেও আসলে সেটি বনভান্তের একটি প্রতিকৃতি ভাস্কর্য।
মিয়ানমার সরকার বনভান্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ফাইবারের তৈরি এ প্রতিকৃতি উপহার দিয়েছে রাজবন বিহার কর্তৃপক্ষকে। এ প্রতিকৃতি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে ৯০ শতাংশ ফাইবার, ৮ শতাংশ মোম এবং ২ শতাংশ গাম।
তার আশ্রমের পরিসর, পরিবেশ ও পরিবেশনায় যে কেউ মুগ্ধ হবেন ।
হাজার হাজার লোক (সবাই যে আবার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এমন নয়) জড়ো হয়েছে আশ্রমে। কী অপরূপ মিলনমেলা! নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ_ সকলে হাত ধরে, মৃদু পায়ে যেন আনন্দময় পরিবেশ নির্মাণ করে চলেছে তারা। এখানকার সাধনার পরিসর ও পরিবেশ এবং প্রকাশনা ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা সত্যিই অবাক করার মতো। আশ্রমের অধিবাসীদের পারস্পরিক সম্পর্ক, শৃঙ্খলা, শ্রদ্ধা, দাপ্তরিক পদ-পদবী ও রীতিনীত, ধর্মীয় আচরণ_ সবকিছু মিলে এককথায় মুগ্ধ হবার মতো জায়গা এবং ঘটনার সমাবেশ এই বনভন্তের আশ্রম। কী সুন্দর মিলনের আহ্বান! কী দারুণ সহযোগ।
বনভন্তের এই আশ্রমে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এবং বিনিয়োগে প্রকাশিত হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ ও স্মরণিকা। কিছু দুষপ্রাপ্য গ্রন্থ অনুবাদের মাধ্যমে পালি ভাষা থেকে বাংলায় রূপান্তরেরও কাজ চলছে। আশ্রম ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নিজস্ব ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ছাপাখানা। পার্বত্য অঞ্চলের সুনিবিড় পর্যটন পাটাতনে এই ধর্মজ্ঞানচর্চাকেন্দ্রটি বাংলাদেশসহ সারাপৃথিবীর জ্ঞানক্ষেত্রে যোগ করেছেনতুন ব্যঞ্জনা। আর এখান থেকে দুনিয়ার সব প্রকৃতিপ্রেমী,সৌন্দর্যঘনিষ্ট ও জ্ঞানসাধকরা খুঁজে পাবে ভিন্নতর প্রণোদনা। ভ্রমণে দেখার আনন্দের সাথে খুব সহজেই যুক্ত হবে জানার নতুন ভুবন। সাংস্কৃতিক ভাববিনিময়ের সাথে মিলবে ধর্মচিন্তা, সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি ও সৌহার্দ্যবোধের অপার সুযোগ ও সাধনার আলোকময় পধের সন্ধান।
পাহাড়,ঝর্না,নদী,লেক,মেঘ ও সবুজের অপূর্ব নীলিমা রাঙামাটি ঘুরতে আসলে সকলেই প্রথমে রাজবন বিহার তালিকায় রাখে, কিন্তু অধিকাংশ জানেই না মমির খবর।
অবশ্যই দেখার মত কিছু।
রাজবন বিহারের কাছাকাছি স্থান গুলো হল :-
পলওয়েল পার্ক,
অরণ্যক রিসোর্ট,
ঝুলন্ত ব্রীজ,
শুভলং ঝর্না,
আদিবাসী পাড়া ইত্যাদি।
এসব একদিনেই দর্শন করা সম্ভব।

No comments