সন্দ্বীপ ভ্রমণ: প্রাচীন ঐতিহ্যের দ্বীপের সম্পূর্ণ গাইড
![]() |
| অপরূপ সন্ধীপ |
সন্দ্বীপ ভ্রমণ: প্রাচীন ঐতিহ্যের দ্বীপের সম্পূর্ণ গাইড
সন্দ্বীপ বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত একটি প্রাচীন দ্বীপ, যা মেঘনা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত। এর অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থান এবং অতিথি পরিবেশ পর্যটকদের মুগ্ধ করে। প্রায় ৪৫০,০০০ জনসংখ্যার এই দ্বীপটি ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৫-১৫ কিলোমিটার প্রশস্ত। সন্দ্বীপের মাঠ, বাজার, প্রাচীন স্থাপত্য এবং সাগরের সঙ্গে মিশে থাকা পরিবেশ আপনার ভ্রমণকে স্মরণীয় করে তুলবে।
![]() |
| সন্ধীপের সবুজ চরে আজিজ স্যারের সাথে |
সন্দ্বীপের দর্শনীয় স্থানসমূহ
১. দ্বীপবন্ধু মুস্তাফিজুর রহমান জেটি
সন্দ্বীপ গুপ্তছড়া ঘাটে নির্মিত এই জেটি সন্দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ। সাগরের গর্জন, শীতল বাতাস, এবং ল্যাম্পপোস্টের আলোতে জেটির সৌন্দর্য দ্বিগুণ হয়। জেটির দুই পাশে বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ বন পরিবেশকে আরও মনোরম করে তোলে। সন্ধ্যার সময় এখানে বসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করুন।
২. রহমতপুর সমুদ্র সৈকত
রহমতপুর ইউনিয়নে অবস্থিত এই সমুদ্র সৈকতটি স্থানীয়ভাবে পরিচিত “পুরাতন স্টিমারঘাট” নামে। পড়ন্ত বেলার সূর্যাস্তের দৃশ্য এবং সমুদ্রের শীতল বাতাস এই জায়গাটিকে ক্যাম্পিংয়ের জন্য আদর্শ স্থান হিসেবে তৈরি করেছে। সৈকতের ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যজুড়ে আপনি নির্জন সময় কাটানোর সুযোগ পাবেন।
৩. সবুজ চর
সন্দ্বীপের দীঘাপাড়া ইউনিয়নে অবস্থিত সবুজ চর, যা স্থানীয়দের কাছে "গ্রিনল্যান্ড" নামে পরিচিত। এটি একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা চর, যেখানে সবুজ ঘাসের বিস্তৃত গালিচা, ম্যানগ্রোভ বন, এবং পাখির কলকাকলিতে ভ্রমণকারীদের মুগ্ধ করে। শীতকালে অতিথি পাখির সমাগম এই জায়গাকে আরও বিশেষ করে তোলে।
৪. মরিয়ম বিবি সাহেবানী মসজিদ
দ্বীপের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত শত বছরের পুরনো এই মসজিদ তাজমহলের আদলে নির্মিত। মসজিদের সঙ্গে সংলগ্ন বড় দীঘি এবং মাজার সন্দ্বীপের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।
৫. ঐতিহ্যবাহী শুকনা দীঘি
দ্বীপের দক্ষিণে অবস্থিত শুকনা দীঘি এক ঐতিহাসিক স্থান, যা স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
![]() |
| সন্ধীপের নৈসর্গিক দৃশ্য |
সন্দ্বীপ ভ্রমণের জন্য শীতকালই সেরা। অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত দ্বীপের আবহাওয়া শীতল ও মনোরম থাকে। এই সময় সমুদ্র শান্ত থাকে এবং ক্যাম্পিং ও সূর্যাস্ত উপভোগের জন্য এটি আদর্শ।
সন্দ্বীপে কীভাবে যাবেন
স্টিমারে সন্দ্বীপ যাত্রা
ঢাকার সদরঘাট থেকে সপ্তাহে তিন দিন স্টিমার ছেড়ে যায়, যা সকাল ৯টায় সন্দ্বীপের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। ভাড়া জনপ্রতি:
- ডেক: ৩০০-৩৫০ টাকা
- সিঙ্গেল কেবিন: ১২০০-১৫০০ টাকা
- ডাবল কেবিন: ২০০০-২৫০০ টাকা
সড়ক পথে যাত্রা
- ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম: ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে চট্টগ্রামগামী বাসে সীতাকুণ্ডের কুমিরা স্টিমার ঘাট পর্যন্ত যেতে পারেন। নন-এসি বাস ভাড়া: ৪০০-৫০০ টাকা।
- কুমিরা থেকে সন্দ্বীপ:
- স্পিডবোটে ভাড়া: ৩০০-৩৫০ টাকা
- ট্রলারে ভাড়া: ১৫০ টাকা
- সী-ট্রাকে ভাড়া: ১২০ টাকা
কুমিরা স্টিমার ঘাট থেকে গুপ্তছড়া ঘাটে পৌঁছানোর পর সিএনজি বা মোটরসাইকেলে এনাম নাহারে যাওয়া যায়।
থাকার ব্যবস্থা
আবাসিক হোটেল
- হোটেল গ্রীন ভিউ (আবাসিক)
ফোন: ০১৭১২৯৮৫৩০৯ - ফয়সাল গেস্ট হাউস
ফোন: ০১৮৩১১৪০৫৮২ - হোটেল মোল্লা
ফোন: ০১৮২০২৬৮০৪২ - রয়েল ইন আবাসিক
ফোন: ০১৮৭৪৭৭৭৭৭৫
উপজেলা পরিষদের ডাকবাংলো
যোগাযোগ: মাহমুদুর রহমান (কেয়ারটেকার)
ফোন: ০১৮১১৩৪১৭২২
ক্যাম্পিং
রহমতপুর সমুদ্র সৈকত ক্যাম্পিংয়ের জন্য সেরা স্থান। নিজের তাবু সঙ্গে নিয়ে স্থানীয়দের সাহায্যে নির্ধারিত জায়গায় ক্যাম্পিং করতে পারেন।
খাবারের সুবিধা
সন্দ্বীপে স্থানীয় খাবার বেশ সহজলভ্য। সাধারণ খাবারের জন্য প্রতি বেলা জনপ্রতি খরচ: ১০০-১৫০ টাকা।
- ঐতিহ্যবাহী খাবার: শিবের হাটের “বিনয় সাহার ছানা মিষ্টি” (৮০ বছরের পুরনো)।
- রেস্টুরেন্ট: গ্রীন চিলিজ রেস্টুরেন্ট (ইন্ডিয়ান, চাইনিজ)।
ভ্রমণের প্রয়োজনীয় টিপস
- ক্যাম্পিংয়ের জন্য তাবু, পাওয়ার ব্যাংক, এবং টর্চ সঙ্গে রাখুন।
- স্থানীয় গাইডের সাহায্য নিন।
- পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন।
- সমুদ্রপথে যাত্রার সময় জোয়ারের সময়সূচি জেনে নিন।
- সঠিক দাম নিশ্চিত করার জন্য দর কষাকষি করুন।
সন্দ্বীপ ভ্রমণ খরচের সারসংক্ষেপ (প্রতি ব্যক্তি)
- সড়কপথ: ৫০০-৭০০ টাকা
- জলপথ (স্পিডবোট/ট্রলার): ১৫০-৩৫০ টাকা
- আবাসন: ৫০০-১৫০০ টাকা
- খাবার: ১০০-১৫০ টাকা প্রতি বেলা
- অন্যান্য: ৫০০ টাকা
সন্দ্বীপ বাংলাদেশের এক প্রাচীন রত্ন। এর মনোরম প্রকৃতি, ঐতিহাসিক স্থান, এবং অতিথি পরিবেশ আপনাকে নিরাশ করবে না। শীতের মৌসুমে একবার সন্দ্বীপ ভ্রমণ করে জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা নিয়ে আসুন।
আরো পড়ুনঃসোনাদিয়া দ্বীপ: বাংলার স্বর্ণদ্বীপে ভ্রমণের সম্পূর্ণ গাইড



No comments