আল্লাহর নবী হযরত ঈসা আঃ কে নিয়ে খ্রিষ্টানদের বিভ্রান্তিকর তথ্য।
আল্লাহর নবী হযরত ঈসা আঃ কে নিয়ে খ্রিষ্টানদের বিভ্রান্তিকর তথ্য।
কাপ্তাই জেটি ঘাট থেকে বোটে চড়ে ৩ ঘন্টায় বিলাইছড়ি, সেখান থেকে আবারো বোটে চড়ে কাপ্তাই লেক পেরিয়ে,রাইক্ষং খাল বেয়ে আরো ২ ঘন্টায় গাছকাটায় পৌছি, গাছকাটা থেকে বিশালকার পাহাড়,বন বাদড় বেয়ে পায়ে হেটে ২ ঘন্টা ৩৫ মিনিটে যখন ফারুয়া পাড়ায় পৌছি,তখন সভ্যতার আশা করা বোকামি,সে আশায় গুড়েবালি দিয়ে অতিকায় গির্জা আমাদের সাদর সম্ভাষণ জানাল, সামনে ঝুলছে ডিজিটাল ব্যানার,
ক্রুশবিদ্ধ কল্পিত যিশুর মাথায় লেখা আছে "আমাদের পাপের ভার নিজের কাঁধে নিয়ে ক্রুশবিদ্ধ হলেন যিশু"
পদতলে লেখা আছে " যিশু মৃত্যুকে জয় করে কবর থেকে উঠেছেন"
(করোনাকালীন সময়ে ধূপপানি ভ্রমন)
চকরিয়া থেকে ২ ঘন্টায় থানচি বাজার, সেখান থেকে পর্দা মোড়ানো জিপে চড়ে, সেনাবাহিনীর চোখে ধূলো দিয়ে বাকলাই পাড়া।
তারপর ৩ ঘন্টার অবিশ্রান্ত হাটাপথে শ্বাপদ সংকুল পথ মাড়িয়ে, পাহাড়,বন বাদড় পেরিয়ে জাদিপাই পাড়া, মেঘেরও বহু উপরে প্রতিষ্টিত এই পাড়ায় সারা বছর শীতকাল, কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমোতে হয়,
সেখানেও একই গির্জা,একই ব্যানার, একই লেখা।
জাদিপাই পাড়া থেকে ৩ ঘন্টায় হাটাপথে লুংথাউসি পাড়া, পুরো হাটা পথটা হাজারের উপরে ফুট মাড়িয়ে পেরোতে হয়।
একই ব্যানার,একই গির্জা এবং একই স্লোগান লুংথাউসি পাড়ায়।
সেখান থেকে আর ৩ ঘন্টার পথ রাইক্ষং পাড়া, এখানে পৌছার পর জীবনী শক্তি বলে আর কিছু থাকে না,কিন্তু এই পাড়ার গির্জাটি বিশাল,সভ্যতা বিবর্জিত দূর্গম এই স্থানে এসে পড়েছে ইট পাথর,গড়ে উঠেছে অতিকায় গির্জা, সেই একই ব্যানার,একই স্লোগান, একই দৃশ্য।
( সম্প্রীতিক সময়ে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে রোড তৈরি করা হয়েছে এবং হচ্ছে, কিন্তু বৈধ পথে যাবার অনুমতি নেই, গল্প গুলো ২০২২ সালের "থানচি টু রুমা সার্কিট ট্রেক" এর)
রাঙামাটির চাকমা,মারমা,ত্রিপুরা, বান্দরবানের বম,,খুই,মুরং জাতিগোষ্ঠী ইতিমধ্যে তাদের গৌতম বুদ্ধের ধর্মের ছেড়ে খ্রিষ্টধর্মে আশ্রয় নিয়েছে, মিশনারীগণ তাদেরকে ইচ্ছেমত বানোয়াট কিচ্ছা কাহিনী গলদকরণ করাচ্ছে।
যিশু কে?
বিবর্তিত বাইবেলে হযরত ঈসা আঃ কে যিশু নামে উল্লেখ করা হয়েছে এবং খ্রিষ্টানরা তার অনুসারী বলে দাবী করে থাকেন।
আল্লাহর পবিত্র নবী হযরত ঈসা আঃ তার পূর্ববর্তী নবীগণ এবং পূর্ববর্তী কিতাব "যবুর" এর সত্যায়নকারী একই সাথে যবুর রহিতকারী নবী।
কিন্তু যবুর অনুসরণকারী বনী ঈসরায়েলগণ এই নবীকে মেনে নিতে পারেনি, এমনকি তার পূর্ববর্তী নবীগণকেও মেনে নেননি, হাজারো নবীর রক্তে রঞিত বনী ঈসরায়েলগণ নবী ঈসা আঃ এর ব্যাপারেও হেটেছে একই পথে।
তারা ইসা আঃ কে হত্যার চক্রান্ত করেন এবং আজকের প্রচলিত অনেক গাল গল্পের রচনা করেন।
ইসা আঃ তার পরবর্তী নবীর ও কিতাবের ব্যাপারেও সত্যায়ন করেছেন, কিন্তু ইসা আঃ এর অনুসারী দাবিদার খ্রিষ্টানগণ বনী ঈসরায়েলের মতই পরবর্তী নবী ও কিতাবকে গ্রহণ করার চেয়ে বিবর্তনের শিকার ইঞ্জিল ( বাইবেল)কে গ্রহণ করেছেন, রহিত হয়ে যাওয়া কিতাবকে পরিত্যাগ করেনি।
তারাও হেটেছে তাদের যিশুর দুশমন বনী ঈসরায়েল কওমের পথে।
হযরত ঈসা আঃ এর অনন্য বৈশিষ্ট্য :
বৈশিষ্ট্য গুলো দেখা যাক,
১। সকল নবীগণ ৪০ বছর বয়সে নবুওয়ত প্রাপ্ত হলেও হযরত ঈসা আঃ তার আগেই নবুওয়াত ও কিতাব প্রাপ্ত হন, কেননা পবিত্র কোরআন ও হাদীসের বিভিন্ন বর্ননামতে তিনি উর্ধরোহনের সময় তার বয়স হয়েছিল ৩৫ বছর।
পৌড় বয়সে তিনি দুনিয়ায় আগমন করবেন এবং ইসলামের দাওয়াত দিবেন।
২। পিতা ছাড়াই কুমারী মাতা হযরত মরিয়ম আঃ এর গর্ভে এসেছিলেন তিনি।
মায়ের কোলে থাকা অবস্থায় তার জবানে নিজের মাতৃত্বের সতীত্বের বিষয়টি সম্পর্কে সাক্ষ্য দেন।
৩। সকল নবী রসুল দেশান্তরে হিজরত করেছেন, কিন্তু আল্লাহর এই নবী দুনিয়া থেকে আকাশে হিজরত করেছেন, সেখানে জীবিত আছেন, শেষ জমানায় তিনি দুনিয়াতে আসবেন এবং শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্টা করে চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুর অমীয় সূধা পান করবেন।
৪। তিনি নবী হিসাবে এসেছিলেন, কিতাব এনেছিলেন, তিনি উম্মত হিসাবে যাবেন এবং তার কিতাবের রহিতকারী কোরআনের অনুসরনে দাওয়াত দিয়েছেন এবং দিবেন।
৫। তার কওমের জন্য "মান্না ও সালওয়া" তথা আসমান থেকে সরাসরি খাদ্য প্রেরণ করা হয়েছিল।
উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যবালী মনে রেখে পরবর্তী ধাপ সমূহ পাঠ করে গেলে আশা করি বিভ্রান্তিকর তথ্যাবলী অপনোদনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
৬। তিনি কবর থেকে মানুষকে জীবিত করতে পারতেন এবং সকল জটিল রোগীকে নিমিষেই সুস্থ করে তুলতেন।
কোরআন ও হাদীসের বর্ননামতে হযরত ঈসা আঃ এর জন্ম, দাওয়াত ও উর্ধলোকে আরোহন।
পবিত্র কোরআন ও হাদীসে হযরত ঈসা আঃ এর সম্পর্কে বিস্তারিত বিবৃত করা হয়েছে, ইসলামি তফসিরবিদগণ সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা সহকারে সকল ভ্রান্ত কথার জবাব দিয়েছেন।
নকলী দলিল বিশ্বাসযোগ্য না হলে আকলী দলিল দিয়ে বিবেচনার বিষয় যে, কথিত যিশু সম্পর্কে কোরআন ও হাদীসে যা বলেছেন, তা যৌক্তিক! নাকি বিবর্তনের শিকার বাইবেলের কথা যৌক্তিক।
হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম চিরকুমারী পূতঃপবিত্র মারইয়াম আলাইহাস সালামের কাছে এসে বললেন, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত একজন দূত। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে একজন পুত্র সন্তান দান করতে চান। যিনি ভবিষ্যতে নবী হবেন, মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকবেন এবং কোলে থাকতেই কথা বলবেন।
এ কথা শুনে তিনি বললেন, আমার সন্তান কীভাবে হতে পারে, আমার তো বিয়েই হয়নি। কখনো কোনো পুরুষ আমাকে স্পর্শ করেনি, আমি ব্যভিচারিণীও নই।
উত্তরে জিবরাইল আলাইহিস সালাম মারইয়াম আলাইহাস সালামকে বললেন, এটা সত্য যে, স্বামী ছাড়া নারীর সন্তান হয় না, তবে আল্লাহ তায়ালা চাইলে সন্তান জন্মের কোনো উপকরণ ছাড়াও সন্তান জন্ম হওয়া সম্ভব। তিনি এই ঘটনাকে মানুষের জন্য নিদর্শন বানাতে চান। যেমন তিনি আদম আলাইহিস সালামকে মা-বাবা ছাড়া সৃষ্টি করেছেন।
হজরত মারইয়াম আলাইহাস সালাম আল্লাহর নির্দেশের কথা শুনে তা মেনে নিলেন। তখন হজরত জিবরাইল মারইয়াম আলাইহিস সালাম তার জামার কলারের মধ্যে ফুঁ দিলেন, এরপর মারইয়াম মারইয়াম আলাইহাস সালাম আল্লাহর হুকুমে গর্ভবতী হয়ে গেলেন।
ইমাম মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক রহিমাহুল্লাহ বলেন, মারইয়াম আলাইহাস সালামের গর্ভের বিষয়টি যখন লোকজন জানতে পারল, তারা তাকে নিয়ে কটু কথা শুরু করলো এবং তাকে বিভিন্ন অপবাদ দিতে শুরু করল।
মানুষজনের কটুকথা আর আপবাদের মুখে হজরত মারইয়াম আলাইহাস সালাম লোকালয় থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন এবং নির্জন স্থানে চলে গেলেন, যেখানে তাকে কেউ দেখতে পাবে না এবং তিনিও কাউকে দেখতে পাবেন না। লোকালয় থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর তার প্রসব বেদনা উঠলো। তখন তিনি একটি খেজুর গাছের নিচে বসে পড়েন।
কথিত আছে, এই নির্জন স্থানটি ছিল বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব দিকের কক্ষটি। আরেক বর্ণনামতে, লোকালয় থেকে বের হয়ে তিনি যখন সিরিয়া ও মিসরের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছেন তখন তার প্রসব বেদনা শুরু হয়। আরেক বর্ণনায় পাওয়া যায়, লোকালয় থেকে বের হয়ে তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে আট মাইল দূরে গিয়েছিলেন। যেখানে হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের জন্ম হয় সেই জায়গাটির নাম ছিলো বাইতে লাহাম। তাফসির গ্রন্থ ইবনে কাসিরে বলা হয়েছে, বায়তুল মুকাদ্দাসের আশপাশে কোথাও জন্মগ্রহণ করেছিলেন হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম, এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন।
হজরত মারইয়াম আলাইহাস সালামের প্রসব বেদনার ওঠার পর তিনি নিজের মৃত্যু কামনা করতে লাগলেন। একে তো প্রসব বেদনা, এর বাইরে তার মনে তখন ধারণা জন্মেছিলো যে, তার কোলে সন্তান দেখার পর কেউ তার কথা বিশ্বাস করতে চাইবে না, তার কথাকে মনগড়া মনে করবে। তার নামে বদনাম রটাবে। এসময় প্রসব ব্যথার থেকেও মৃত্যুকে তার কাছে বেশি সহজ মনে হলো। তিনি বললেন, হায় আমি যদি মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে পারতাম।
হজরত মারইয়াম আলাইহাস সালাম যখন সন্তান নিয়ে লোকালয়ে ফিরলেন, তাকে মানুষের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হলো। পবিত্র কোরআনের সূরা মারইয়ামের ১৬ থেকে ৩৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পুরো ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেছেন এভাবে-
وَاذۡکُرۡ فِی الۡکِتٰبِ مَرۡیَمَ ۘ اِذِ انۡتَبَذَتۡ مِنۡ اَہۡلِہَا مَکَانًا شَرۡقِیًّا ۙ ١٦ فَاتَّخَذَتۡ مِنۡ دُوۡنِہِمۡ حِجَابًا ۪۟ فَاَرۡسَلۡنَاۤ اِلَیۡہَا رُوۡحَنَا فَتَمَثَّلَ لَہَا بَشَرًا سَوِیًّا ١٧ قَالَتۡ اِنِّیۡۤ اَعُوۡذُ بِالرَّحۡمٰنِ مِنۡکَ اِنۡ کُنۡتَ تَقِیًّا ١٨ قَالَ اِنَّمَاۤ اَنَا رَسُوۡلُ رَبِّکِ ٭ۖ لِاَہَبَ لَکِ غُلٰمًا زَکِیًّا ١٩ قَالَتۡ اَنّٰی یَکُوۡنُ لِیۡ غُلٰمٌ وَّلَمۡ یَمۡسَسۡنِیۡ بَشَرٌ وَّلَمۡ اَکُ بَغِیًّا ٢۰ قَالَ کَذٰلِکِ ۚ قَالَ رَبُّکِ ہُوَ عَلَیَّ ہَیِّنٌ ۚ وَلِنَجۡعَلَہٗۤ اٰیَۃً لِّلنَّاسِ وَرَحۡمَۃً مِّنَّا ۚ وَکَانَ اَمۡرًا مَّقۡضِیًّا ٢١ فَحَمَلَتۡہُ فَانۡتَبَذَتۡ بِہٖ مَکَانًا قَصِیًّا ٢٢ فَاَجَآءَہَا الۡمَخَاضُ اِلٰی جِذۡعِ النَّخۡلَۃِ ۚ قَالَتۡ یٰلَیۡتَنِیۡ مِتُّ قَبۡلَ ہٰذَا وَکُنۡتُ نَسۡیًا مَّنۡسِیًّا ٢٣ فَنَادٰىہَا مِنۡ تَحۡتِہَاۤ اَلَّا تَحۡزَنِیۡ قَدۡ جَعَلَ رَبُّکِ تَحۡتَکِ سَرِیًّا ٢٤ وَہُزِّیۡۤ اِلَیۡکِ بِجِذۡعِ النَّخۡلَۃِ تُسٰقِطۡ عَلَیۡکِ رُطَبًا جَنِیًّا ۫ ٢٥ فَکُلِیۡ وَاشۡرَبِیۡ وَقَرِّیۡ عَیۡنًا ۚ فَاِمَّا تَرَیِنَّ مِنَ الۡبَشَرِ اَحَدًا ۙ فَقُوۡلِیۡۤ اِنِّیۡ نَذَرۡتُ لِلرَّحۡمٰنِ صَوۡمًا فَلَنۡ اُکَلِّمَ الۡیَوۡمَ اِنۡسِیًّا ۚ ٢٦ فَاَتَتۡ بِہٖ قَوۡمَہَا تَحۡمِلُہٗ ؕ قَالُوۡا یٰمَرۡیَمُ لَقَدۡ جِئۡتِ شَیۡئًا فَرِیًّا ٢٧ یٰۤاُخۡتَ ہٰرُوۡنَ مَا کَانَ اَبُوۡکِ امۡرَاَ سَوۡءٍ وَّمَا کَانَتۡ اُمُّکِ بَغِیًّا ۖۚ ٢٨ فَاَشَارَتۡ اِلَیۡہِ ؕ قَالُوۡا کَیۡفَ نُکَلِّمُ مَنۡ کَانَ فِی الۡمَہۡدِ صَبِیًّا ٢٩ قَالَ اِنِّیۡ عَبۡدُ اللّٰہِ ۟ؕ اٰتٰنِیَ الۡکِتٰبَ وَجَعَلَنِیۡ نَبِیًّا ۙ ٣۰ وَّجَعَلَنِیۡ مُبٰرَکًا اَیۡنَ مَا کُنۡتُ ۪ وَاَوۡصٰنِیۡ بِالصَّلٰوۃِ وَالزَّکٰوۃِ مَا دُمۡتُ حَیًّا ۪ۖ ٣١ وَّبَرًّۢا بِوَالِدَتِیۡ ۫ وَلَمۡ یَجۡعَلۡنِیۡ جَبَّارًا شَقِیًّا ٣٢ وَالسَّلٰمُ عَلَیَّ یَوۡمَ وُلِدۡتُّ وَیَوۡمَ اَمُوۡتُ وَیَوۡمَ اُبۡعَثُ حَیًّا ٣٣ ذٰلِکَ عِیۡسَی ابۡنُ مَرۡیَمَ ۚ قَوۡلَ الۡحَقِّ الَّذِیۡ فِیۡہِ یَمۡتَرُوۡنَ ٣٤
আর স্মরণ করুন। এ কিতাবে মারইয়ামকে, যখন সে তার পরিবারের কাছ থেকে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল, তারপর সে তাদের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করল। তখন আমি তার কাছে আমার রূহকে (জিবরাঈল আলাইহিস সালাম) পাঠালাম, সে তার কাছে পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্ৰকাশ করল।
মারইয়াম বলল, আমি তোমার থেকে দয়াময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করছি (আল্লাহকে ভয় কর) যদি তুমি মুত্তাকী হও। সে বলল, আমি তো তোমার রব-এর দূত, তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করার জন্য (আমি প্রেরিত হয়েছি)। মারইয়াম বলল, কেমন করে আমার পুত্র হবে, যখন আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই!
সে বলল, ‘এই ভাবেই হবে; তোমার প্রতিপালক বলেছেন, এটা আমার জন্য সহজসাধ্য এবং তাকে আমি এই জন্য সৃষ্টি করব, যেন সে হয় মানুষের জন্য এক নিদর্শন ও আমার কাছ থেকে এক অনুগ্রহ; এটা তো এক স্থিরীকৃত ব্যাপার।’
এরপর সে গর্ভে সন্তান ধারণ করল ও তাকে নিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেল। প্রসব-বেদনা তাকে এক খেজুর গাছের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। সে বলল, হায়, এর আগে যদি আমি মরে যেতাম এবং মানুষের স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে যেতাম!
তখন ফেরেশতা (জিবরাঈল) তার নিচ থেকে ডেকে তাকে বলল, তুমি পেরেশান হয়ো না,তোমার রব তোমার নিচে একটি ঝর্ণা সৃষ্টি করেছেন। আর তুমি খেজুর গাছের কান্ড ধরে তোমার দিকে নাড়া দাও, তাহলে তা তোমার উপর তাজা-পাকা খেজুর ফেলবে। তুমি খাও, পান কর এবং চোখ জুড়াও। আর যদি তুমি কোন লোককে দেখতে পাও তাহলে বলে দিও, ‘আমি পরম করুণাময়ের জন্য চুপ থাকার মানত করেছি। অতএব আজ আমি কোন মানুষের সাথে কিছুতেই কথা বলব না’।
তারপর সে সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হল; তারা বলল, হে মারইয়াম! তুমি তো এক অঘটন করে বসেছ। হে হারূনের বোন! তোমার বাবা অসৎ ব্যক্তি ছিল না এবং তোমার মা'ও ছিল না ব্যভিচারিণী।
মারইয়াম তখন ইঙ্গিতে সন্তানকে দেখাল। তারা বলল, যে দোলনার শিশু তার সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব?’ (শিশুটি) বলল, ‘নিশ্চয় আমি আল্লাহর বান্দা; তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। যেখানেই আমি থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন জীবিত থাকি ততদিন নামাজ ও জাকাত আদায় করতে। আর আমাকে আমার মায়ের প্রতি অনুগত করেছেন এবং তিনি আমাকে করেননি দাম্ভিক, হতভাগ্য। আমার প্রতি শান্তি, যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি ও যেদিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন আমি জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হব।
এই হচ্ছে মারইয়াম পুত্র ঈসা। এটাই সঠিক বক্তব্য, যে বিষয়ে লোকেরা সন্দেহ পোষণ করছে। (সূরা মারইয়াম, (১৯), আয়াত, ১৬-৩৪, তাফসিরে ইবনে কাসির, ১৪-খণ্ড, ১৪৬)
হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম ও ওহীর সূচনা
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত ঈসা (আ) বায়তুল মুকাদ্দাসের সন্নিকটে বায়তে লাহমে জন্মগ্রহণ করেন।
ওহাব ইব্ন মুনাববিহ উল্লেখ করেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) যখন ভূমিষ্ঠ হন তখন পূর্ব ও পশ্চিমের সমস্ত মূর্তি ভেঙ্গে পড়ে যায়। ফলে শয়তানরা অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়ে। এর কোন কারণ তারা খুঁজে পাচ্ছিল না। অবশেষে বড় ইবলীস তাদেরকে জানাল যে, ঈসা (আ)-এর জন্ম হয়েছে। শয়তানরা শিশু ঈসাকে তার মায়ের কোলে আর চারদিকে ফেরেশতাগণ দাড়িয়ে তাকে ঘিরে রেখেছেন দেখতে পেল। তারা আকাশে উদিত একটি বিরাট নক্ষত্রও দেখতে পেল। পারস্য সম্রাট এই নক্ষত্র দেখে শংকিত হয়ে পড়েন এবং জ্যোতিষীদের নিকট এর উদিত হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। জ্যোতিষীরা জানাল, পৃথিবীতে এক মহান ব্যক্তির জন্ম হয়েছে। এজন্য এই নক্ষত্র উদিত হয়েছে। তখন পারস্য সম্রাট উপটৌকন হিসেবে স্বর্ণ, চান্দি ও কিছু লুব্বান দিয়ে নবজাতকের সন্ধানে কতিপয় দূত প্রেরণ করেন। দূতগণ সিরিয়ায় এসে পৌছে। সিরিয়ার বাদশাহ তাদের আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তারা উক্ত নক্ষত্র ও জ্যোতিষীদের মন্তব্যের কথা তাকে জানায়। বাদশাহ দূতদের নিকট নক্ষত্রটির উদয়কাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। উত্তর শুনে তিনি বুঝলেন, ঐ শিশুটি বায়তুল মুকাদ্দাসে জন্ম গ্রহণকারী মারিয়াম পুত্র ঈসা। ইতিমধ্যেই ব্যাপক প্রচার হয়ে গিয়েছিল যে, নবজাত শিশুটি দোলনায় থেকেই মানুষের সাথে কথা বলেছেন। এরপর বাদশাহ দূতদেরকে তাদের সাথে আনীত উপটৌকনসহ শিশু ঈসার নিকট পাঠিয়ে দেন এবং এদেরকে চিনিয়ে দেয়ার জন্যে সাথে একজন লোকও দেন। বাদশাহর উদ্দেশ্য ছিল, দূতগণ যখন উপঢৌকন প্রদান করে চলে আসবে, তখন এ লোক ঈসাকে হত্যা করে ফেলবে। পারস্যের দূতগণ মারয়ামের নিকট গিয়ে উপঢৌকনগুলো প্ৰদান করে চলে আসার সময় বলে আসলো যে, সিরিয়ার বাদশাহ আপনার নবজাত শিশুকে হত্যা করার জন্যে চর পাঠিয়েছে। এ সংবাদ শুনে মারিয়াম শিশুপুত্র ঈসাকে নিয়ে মিসরে চলে আসেন এবং একটানা বার বছর সেখানে অবস্থান করেন। এ সময়ের মধ্যে ঈসা (আ)-এর বিভিন্ন রকম কারামত ও মুজিযা প্ৰকাশ হতে থাকে।
ওহাব ইব্ন মুনাববিহ কতিপয় মুজিযার কথা উল্লেখ করেছেন। যথা:-
(এক) বিবি মারিয়াম মিসরের যে সর্দারের বাড়িতে অবস্থান করেন, একদা ঐ বাড়ি থেকে একটি বস্তু হারিয়ে যায়। ভিক্ষুক, দরিদ্র ও অসহায় লোকজন সে বাড়িতে বসবাস করত। কে বা কারা বস্তুটি চুরি করেছে, তা অনুসন্ধান করেও তার কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। বিষয়টি মারিয়ামকে ভীষণ চিন্তায় ফেলে দিল। বাড়ির মালিক ও অন্যান্য লোকজনও বিব্রত অবস্থায় পড়ে গেল। অবশেষে শিশু ঈসা সেখানে অবস্থানকারী এক অন্ধ ও এক পঙ্গু ব্যক্তির নিকট গেলেন। অন্ধকে বললেন, তুমি এ পঙ্গুকে ধরে উঠাও এবং তাকে সাথে নিয়ে চুরি করা বস্তা নিয়ে এস। অন্ধ বলল, আমি তো তাকে উঠাতে সক্ষম নই। ঈসা বললেন, কেন, তোমরা উভয়ে যেভাবে ঘরের জানালা দিয়ে-বস্তুটি নিয়ে এসেছিলে, সেভাবেই গিয়ে নিয়ে এস। এ কথা শোনার পর। তারা এর সত্যতা স্বীকার করল এবং চুরি করা বস্তুটি নিয়ে আসলো। এ ঘটনার পর ঈসার মর্যাদা মানুষের নিকট অত্যধিক বেড়ে যায়। যদিও তিনি তখন শিশু মাত্র।
(দুই) উক্ত সর্দারের পুত্র আপনি সন্তানদের পবিত্রতা অর্জনের উৎসবের দিনে এক ভোজ সভার আয়োজন করে। লোকজন সমবেত হল। খাওয়া-দাওয়া শেষ হল। সে যুগের নিয়মানুযায়ী এখন মদ পরিবেশনের পালা। কিন্তু মদ ঢালতে গিয়ে দেখা গেল কোন কলসীতেই মদ নেই। সর্দার পুত্র ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেল। হযরত ঈসা (আ) এ অবস্থা দেখে প্রতিটি কলসীর মুখে হাত ঘুরিয়ে আসলেন। ফলে সেগুলো সাথে সাথে উৎকৃষ্ট মদে পূর্ণ হয়ে গেল। লোকজন। এ ঘটনা দেখে বিস্মিত হলো। ফলে, তাদের নিকট আরও মর্যাদা বৃদ্ধি পেল। মানুষ বিভিন্ন রকম উপটোকন এনে ঈসা ও তার মার কাছে পেশ করলো। কিন্তু তারা এর কিছুই গ্রহণ করলেন না। তারপর তারা বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে পড়লেন।
ইসহাক ইব্ন বিশর. আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। হযরত ঈসা ইব্ন মারয়ামই প্রথম মানুষ, যিনি শিশুকালে কথা বলেছেন। আল্লাহ তাঁর রসনা খুলে দেন এবং তিনি আল্লাহর প্রশংসায় এমন অনেক কথা বলেন, যা ইতিপূর্বে কোন কান কখনও শোনেনি। এ প্রশংসায় তিনি চাঁদ, সুরুজ, পর্বত, নদী, ঝর্ণা কোন কিছুকেই উল্লেখ করতে বাদ দেননি।
ইসহাক ইব্ন বিশার,… ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। ঈসা ইব্ন মারিয়াম (আ) শিশু অবস্থায় একবার কথা বলেন। এরপর তার কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। অন্যান্য শিশুরা যখন স্বাভাবিক বয়সে কথা বলে থাকে, তিনিও সে বয়সে পুনরায় কথা বলতে শুরু করেন। আল্লাহ তখন তাকে যুক্তিপূৰ্ণ কথা ও বাগিতা শিক্ষা দেন। ইয়াহুদীরা ঈসা (আ) ও তাঁর মা সম্পর্কে জঘন্য উক্তি করে। তাঁকে তারা জারজ সন্তান বলত। আল্লাহর বাণীঃ
এবং তারা লানতগ্রস্ত হয়েছিল তাদের কুফরীর জন্যে ও মারিয়ামের বিরুদ্ধে গুরুতর অপবাদের জন্যে। (৪ নিসাঃ ১৫৬)।
ইব্ন লুহায়আ আব্দুল্লাহ ইব্ন হুবায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আব্দুল্লাহ ইব্ন উমর (রা) বলেছেনঃ ঈসা ইব্ন মারয়াম (আ) কিশোর বয়সে অন্যান্য বালকদের সাথে মাঠে খেলাধুলা করতেন। মাঝে মধ্যে তিনি তাদের কাউকে ডেকে বলতেন, তুমি কি চাও যে, তোমার মা কি কি খাদ্য তোমাকে না দিয়ে গোপন করে রেখেছে, আমি তা বলে দেই? সে বলত, বলে দিন। ঈসা। বলতেন, অমুক অমুক জিনিস গোপন করে রেখেছে। বালকটি তৎক্ষণাৎ দৌড়ে গিয়ে মাকে বলত, আপনি যে সব খাদ্য আমাকে না দিয়ে গোপন করে রেখে দিয়েছেন, তা আমাকে খেতে দিন। মা বলতেন, কি জিনিস আমি গোপন করে রেখেছি? বালক বলত, অমুক অমুক জিনিস। মা বলতেন, এ কথা তোমাকে কে বলেছে? ছেলে বলত, ঈসা ইব্ন মারিয়াম বলেছে। এ কথা জনাজানি হয়ে যাওয়ার পর লোকজন পরামর্শ করল, আমরা যদি ছেলেদেরকে ঈসার সাথে এ ভাবে মেলামেশার সুযোগ দিই তাহলে ঈসা তাদেরকে নষ্ট করে ছাড়বে। সুতরাং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরদিন তারা সকল ছেলেদেরকে একটা ঘরের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখল। ঈসা। বালকদেরকে সন্ধান করে ফিরলেন; কিন্তু কাউকেও খুঁজে পেলেন না। অবশেষে একটি ঘর থেকে তাদের কান্নাজড়িত চিৎকার শুনতে পেয়ে লোকজনের নিকট জিজ্ঞেস করলেন, ঐ ঘরটির ভিতর শব্দ কিসের? তারা ঈসাকে জানাল, ঘরের ওগুলো হচ্ছে বানর ও শূকর। তখন ঈসা বললেন, হে আল্লাহ! ঐ রকমই করে দিন। ফলে বালকগুলো বানর ও শূকরে পরিণত হয়ে গেল। (ইব্ন আসাকির) W
ইসহাক ইব্ন বিশর .ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। হযরত ঈসা আল্লাহর ইঙ্গিত (ইলহাম) অনুযায়ী বাল্যকালে বিস্ময়কর কাজকর্ম দেখাতেন। ইয়াহুদীদের মধ্যে এ কথা ছড়িয়ে পড়ে। ঈসা (আঃ) বয়োবৃদ্ধি লাভ করেন। বনী ইসরাঈলরা তাঁর প্রতি শত্রুতা পোষণ করতে থাকে। তার মা এ জন্যে শংকিত হয়ে পড়েন। তখন আল্লাহ তাকে ওহীর মাধ্যমে ছেলেসহ মিসরে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কুরআন পাকে আল্লাহ বলেন :
وجعلنا ابن مريم وأمة اية واوينهما الې ربوة ذات قراريو معين. —এবং আমি মারিয়াম তনয় ও তার মাকে করেছিলাম এক নিদর্শন, তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছিলাম এক নিরাপদ ও প্রস্রবণ বিশিষ্ট উচ্চ ভূমিতে। (২৩ মুমিনুনঃ ৫০)
ঈসা (আঃ)-এর তওহীদের দাওয়াত
ঈসা (আঃ) নবুঅত লাভ করার পর স্বীয় কওমকে প্রধানতঃ নিম্নোক্ত ৭টি বিষয়ে দাওয়াত দিয়ে বলেন, يَابَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُم مُّصَدِّقاً لِّمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ الةَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ- ‘হে বনু ইস্রাঈলগণ! আমি তোমাদের নিকটে আগমন করেছি (১) আল্লাহর রাসূল হিসাবে (২) আমার পূর্ববর্তী তওরাত কিতাবের সত্যায়নকারী হিসাবে এবং (৩) আমার পরে আগমনকারী রাসূলের সুসংবাদ দানকারী হিসাবে, যার নাম হবে আহমাদ’... (ছফ ৬১/৬)। তিনি বললেন, وَإِنَّ اللهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيْمٌ ‘(৪) নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার পালনকর্তা এবং তোমাদের পালনকর্তা। অতএব তোমরা তাঁর ইবাদত কর। এটাই সরল পথ’ (মারিয়াম ১৯/৩৬)।
তিনি বললেন, وَمُصَدِّقاً لِّمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَِلأُحِلَّ لَكُم بَعْضَ الَّذِيْ حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُم بِآيَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ فَاتَّقُواْ اللهَ وَأَطِيعُونِ- (آل عمران ৫০)- ‘আমার আনীত এ কিতাব (ইনজীল) পূর্ববর্তী কিতাব তাওরাতকে সত্যায়ন করে এবং এজন্য যে, (৫) আমি তোমাদের জন্য হালাল করে দেব কোন কোন বস্ত্ত, যা তোমাদের জন্য হারাম ছিল। আর (৬) আমি তোমাদের নিকটে এসেছি তোমাদের পালনকর্তার নিদর্শন সহ। অতএব (৭) তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর’ (আলে ইমরান ৩/৫০)।
এটার ব্যাখ্যা এসেছে অন্য আয়াতে যে,
فَبِظُلْمٍ مِّنَ الَّذِيْنَ هَادُوْا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَنْ سَبِيْلِ اللهِ كَثِيْرًا- وَأَخْذِهِمُ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوْا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِيْنَ مِنْهُمْ عَذَاباً أَلِيْماً- (النساء ১৬০-১৬১)-
‘বস্ত্ততঃ ইহুদীদের পাপের কারণে আমরা তাদের উপরে হারাম করেছিলাম বহু পবিত্র বস্ত্ত, যা তাদের জন্য হালাল ছিল। এটা ছিল (১) আল্লাহর পথে তাদের অধিক বাধা দানের কারণে’। ‘এবং এ কারণে যে, (২) তারা সূদ গ্রহণ করত। অথচ এ ব্যাপারে তাদের নিষেধ করা হয়েছিল এবং এ কারণে যে, (৩) তারা অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করত। বস্ত্ততঃ আমরা কাফিরদের জন্য প্রস্ত্তত রেখেছি বেদনাদায়ক শাস্তি’ (নিসা ৪/১৬০-১৬১)। তিনি আরও বলেন,
وَعَلَى الَّذِيْنَ هَادُوْا حَرَّمْنَا كُلَّ ذِيْ ظُفُرٍ وَمِنَ الْبَقَرِ وَالْغَنَمِ حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ شُحُومَهُمَا إِلاَّ مَا حَمَلَتْ ظُهُوْرُهُمَا أَوِ الْحَوَايَا أَوْ مَا اخْتَلَطَ بِعَظْمٍ ذَلِكَ جَزَيْنَاهُمْ بِبَغْيِهِمْ وِإِنَّا لَصَادِقُوْنَ- (الأنعام ১৪৬)-
‘এবং ইহুদীদের জন্য আমরা (১) প্রত্যেক নখবিশিষ্ট পশু হারাম করেছিলাম এবং (২) ছাগল ও গরু থেকে এতদুভয়ের চর্বি আমরা তাদের জন্য হারাম করেছিলাম। কিন্তু ঐ চর্বি ব্যতীত যা পৃষ্ঠে কিংবা অন্ত্রে সংযুক্ত থাকে অথবা অস্থির সাথে মিলিত থাকে। তাদের অবাধ্যতার কারণে আমরা তাদের এ শাস্তি দিয়েছিলাম। আর আমরা অবশ্যই সত্যবাদী’ (আন‘আম ৬/১৪৬)।
ঈসা (আঃ)-এর পেশকৃত পাঁচটি নিদর্শন
তাওহীদ ও রিসালাতের উপরে ঈমান আনার দাওয়াত দেওয়ার পরে তিনি বনু ইস্রাঈলকে তাঁর আনীত নিদর্শন সমূহ বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,
وَرَسُوْلاً إِلَى بَنِيْ إِسْرَائِيْلَ أَنِّيْ قَدْ جِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ أَنِّيْ أَخْلُقُ لَكُمْ مِّنَ الطِّيْنِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ فَأَنْفُخُ فِيْهِ فَيَكُوْنُ طَيْراً بِإِذْنِ اللهِ وَأُبْرِئُ الأكْمَهَ والأَبْرَصَ وَأُحْيِـي الْمَوْتَى بِإِذْنِ اللهِ وَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا تَأْكُلُوْنَ وَمَا تَدَّخِرُوْنَ فِيْ بُيُوْتِكُمْ إِنَّ فِيْ ذَلِكَ لآيَةً لَّكُمْ إِنْ كُنتُم مُّؤْمِنِينَ- (آل عمران ৪৯)-
‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের নিকটে তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে এসেছি নিদর্শনসমূহ নিয়ে। (যেমন-) (১) আমি তোমাদের জন্য মাটি দ্বারা পাখির আকৃতি তৈরী করে দেই। তারপর তাতে যখন ফুঁক দেই, তখন তা উড়ন্ত পাখিতে পরিণত হয়ে যায় আল্লাহর হুকুমে। (২) আর আমি সুস্থ করে তুলি জন্মান্ধকে এবং (৩) ধবল-কুষ্ঠ রোগীকে। (৪) আর আমি জীবিত করে দেই মৃতকে আল্লাহর হুকুমে। (৫) আমি তোমাদেরকে বলে দেই যা তোমরা খেয়ে আস এবং যা তোমরা ঘরে রেখে আস। এতে প্রকৃষ্ট নিদর্শন রয়েছে যদি তোমরা বিশ্বাসী হও’ (আলে ইমরান ৩/৪৯)।
উল্লেখ্য যে, যখন যে দেশে যে বিষয়ের আধিক্য ও উৎকর্ষ থাকে, তখন সেই দেশে সেই বিষয়ে সর্বোচ্চ ব্যুৎপত্তি সহ নবী প্রেরণ করা হয়। যেমন মূসার সময় মিসরে ছিল জাদুবিদ্যার প্রাদুর্ভাব। ফলে আল্লাহ তাঁকে লাঠির মো‘জেযা দিয়ে পাঠালেন। অনুরূপভাবে ঈসার সময়ে শাম বা সিরিয়া এলাকা ছিল চিকিৎসা বিদ্যায় সেরা। সেকারণ ঈসাকে আল্লাহ উপরে বর্ণিত অলৌকিক ক্ষমতা ও মো‘জেযা সমূহ দিয়ে পাঠান। যেমন শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সময়ে আরবরা ভাষা ও সাহিত্যের সর্বোচ্চ অলংকারে ভূষিত ছিল। ফলে কুরআন তাদের সামনে হতবুদ্ধিকারী মো‘জেযা রূপে নাযিল হয়। যাতে আরবের স্বনামখ্যাত কবিরা মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়।
দাওয়াতের ফলে ইহুদীগণের চক্রান্ত
ঈসা (আঃ)-এর মো‘জেযা সমূহ দেখে এবং তাঁর মুখনিঃসৃত তাওহীদের বাণী শুনে গরীব শ্রেণীর কিছু লোক তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হ’লেও দুনিয়াদার সমাজ নেতারা তাঁর প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠে। কারণ তাওহীদের সাম্য বাণী সমাজের কায়েমী স্বার্থবাদী নেতাদের স্বার্থেই প্রথম আঘাত হেনে থাকে। শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দেয়। ফলে তারা ঈসা (আঃ)-এর বিরোধিতায় লিপ্ত হয়।
বিগত নবীগণের ন্যায় বনু ইস্রাঈলগণ তাদের বংশের শেষ নবী ঈসা (আঃ)-এর বিরুদ্ধে নানাবিধ চক্রান্ত শুরু করে। তারা প্রথমেই ঈসা (আঃ)-কে ‘জাদুকর’ বলে আখ্যায়িত করে। যেমন আল্লাহ বলেন, (হে ঈসা!) إِذْ جِئْتَهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَقَالَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا مِنْهُمْ إِنْ هَـذَا إِلاَّ سِحْرٌ مُّبِيْنٌ- (المائدة ১১০)- ‘যখন তুমি তাদের কাছে প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিলে। অতঃপর তাদের মধ্যে যারা কাফের তারা বলল, এটা প্রকাশ্য জাদু ব্যতীত কিছুই নয়’ (মায়েদাহ ৫/১১০)।
উক্ত অপবাদে ঈসা (আঃ) ক্ষান্ত না হয়ে বরং আরও দ্বিগুণ বেগে দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে যেতে থাকেন। তখন বিরোধীরা বেছে নেয় অতীব নোংরা পথ। তারা তাঁর মায়ের নামে অপবাদ রটাতে শুরু করে। যাতে ঈসা (আঃ) অত্যন্ত ব্যথা পেলেও নবুঅতের গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সবকিছু নীরবে সহ্য করতে থাকেন। ফলে ঈসা (আঃ)-এর সমর্থক সংখ্যা যতই বাড়তে থাকে, অবিশ্বাসী সমাজ নেতাদের চক্রান্ত ততই বৃদ্ধি পেতে থাকে। এবার তারা তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করল এবং সেজন্য দেশের বাদশাহকে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দেবার ষড়যন্ত্র করল। তারা অনবরত বাদশাহর কান ভারি করতে থাকে এই মর্মে যে, লোকটি আল্লাহ দ্রোহী। সে তাওরাত পরিবর্তন করে সবাইকে বিধর্মী করতে সচেষ্ট। এসব অভিযোগ শুনে অবশেষে বাদশাহ তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেন,
হযরত ঈসা আঃ এর কাছে আল্লাহর পাঁচটি অঙ্গীকার
ইহুদীদের বিপক্ষে হযরত ঈসা (আঃ)-কে সাহায্যের ব্যাপারে আল্লাহ পাঁচটি ওয়াদা করেছিলেন এবং সবক’টিই তিনি পূর্ণ করেন। (১) হত্যার মাধ্যমে নয় বরং তার স্বাভাবিক মৃত্যু হবে (২) তাঁকে ঊর্ধ্বজগতে তুলে নেওয়া হবে (৩) তাকে শত্রুদের অপবাদ থেকে মুক্ত করা হবে (৪) অবিশ্বাসীদের বিপক্ষে ঈসার অনুসারীদেরকে ক্বিয়ামত অবধি বিজয়ী রাখা হবে এবং (৫) ক্বিয়ামতের দিন সবকিছুর চূড়ান্ত ফায়ছালা করা হবে। এ বিষয়গুলি বর্ণিত হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতে। যেমন আল্লাহ বলেন,
إِذْ قَالَ اللهُ يَا عِيْسَى إِنِّيْ مُتَوَفِّيْكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا وَجَاعِلُ الَّذِيْنَ اتَّبَعُوْكَ فَوْقَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأَحْكُمُ بَيْنَكُمْ فِيْمَا كُنْتُمْ فِيْهِ تَخْتَلِفُوْنَ- (آل عمران ৫৫)-
‘আর স্মরণ কর যখন আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! আমি তোমাকে ওফাত দিব এবং তোমাকে আমার কাছে তুলে নেব এবং তোমাকে কাফিরদের হাত থেকে মুক্ত করব। আর যারা তোমার অনুসরণ করবে, তাদেরকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত কাফিরদের বিরুদ্ধে বিজয়ী করে রাখবো। অতঃপর তোমাদের সবাইকে আমার কাছে ফিরে আসতে হবে, তখন আমি তোমাদের মধ্যকার বিবাদীয় বিষয়ে ফায়ছালা করে দেব’ (আলে ইমরান ৩/৫৫)।
ঈসা (আঃ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র ও তাঁর ঊর্ধ্বারোহন
তৎকালীন রোম সম্রাট ছাতিয়ূনুস-এর নির্দেশে (মাযহারী) ঈসা (আঃ)-কে গ্রেফতারের জন্য সরকারী বাহিনী ও ইহুদী চক্রান্তকারীরা তাঁর বাড়ী ঘেরাও করে। তারা জনৈক নরাধমকে ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করার জন্য পাঠায়। কিন্তু ইতিপূর্বে আল্লাহ ঈসা (আঃ)-কে উঠিয়ে নেওয়ায় সে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যায়। কিন্তু এরি মধ্যে আল্লাহর হুকুমে তার চেহারা ঈসা (আঃ)-এর সদৃশ হয়ে যায়। ফলে ইহুদীরা তাকেই ঈসা ভেবে শূলে বিদ্ধ করে হত্যা করে।
ইহুদী-নাছারারা কেবল সন্দেহের বশবর্তী হয়েই নানা কথা বলে এবং ঈসাকে হত্যা করার মিথ্যা দাবী করে। আল্লাহ বলেন, ‘এ বিষয়ে তাদের কোনই জ্ঞান নেই। তারা কেবলই সন্দেহের মধ্যে পড়ে আছে। এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করতে পারেনি’(নিসা ৪/১৫৭)। বরং তার মত কাউকে তারা হত্যা করেছিল ।
উল্লেখ্য যে, ঈসা (আঃ) তাঁর উপরে বিশ্বাসী সে যুগের ও পরবর্তী যুগের সকল খৃষ্টানের পাপের বোঝা নিজে কাঁধে নিয়ে প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ শূলে বিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে খৃষ্টানদের দাবী স্রেফ প্রতারণা ও অপপ্রচার বৈ কিছুই নয়।
যে কৌশলে ঈসা আলাইহিস সালামকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল
মহান আল্লাহ সর্বোত্তম কৌশল গ্রহণকারী। দুনিয়ার সব চক্রান্ত ও কৌশল তাঁর কিছুই নয়। হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার আগে সে কৌশলের প্রমাণ ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের সেই বর্ণনাই উঠে এসেছে কুরআনে। আল্লাহ তাআলা বলেন-وَمَكَرُواْ وَمَكَرَ اللّهُ وَاللّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ - إِذْ قَالَ اللّهُ يَا عِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُواْ وَجَاعِلُ الَّذِينَ اتَّبَعُوكَ فَوْقَ الَّذِينَ كَفَرُواْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأَحْكُمُ بَيْنَكُمْ فِيمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ‘আর কাফেরেরা চক্রান্ত করেছে আর আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করেছেন। বস্তুতঃ আল্লাহ হচ্ছেন সর্বোত্তম কুশলী।আর স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! আমি তোমাকে নিয়ে নেব। এবং তোমাকে নিজের দিকে তুলে নেব। কাফের (অস্বীকারকারী) থেকে তোমাকে পবিত্র করে দেব। আর যারা তোমার অনুগত রয়েছে তাদেরকে কেয়ামতের দিন পর্যন্ত বিজয়ী করব, যারা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে তাদের ওপর। বস্তুত তোমাদের সবাইকে আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে। তখন যে বিষয়ে তোমরা বিবাদ করতে, আমি তোমাদের মধ্যে তার ফয়সালা করে দেব।' (সুরা ইমরান : আয়াত ৫৪-৫৫)
আয়াতের ব্যাখ্যামূলক অনুবাদতারা (অর্থাৎ যারা ঈসা আলাইহিস সালামের নবুয়ত অস্বীকার করেছিল এবং তাঁকে গোপনে নির্যাতন ও হত্যা করার উদ্দেশ্যে) কৌশল গ্রহণ করেছিল (সে মতে ষড়যন্ত্র ও কৌশলে তাঁকে গ্রেফতার করে শূলীতে চড়াতে উদ্যত হলো)।আর আল্লাহ তাআলাও (তাঁকে নিরাপদ রাখার জন্য) গোপন কৌশল অবলম্বন করলেন (ষড়যন্ত্রকারীরা আল্লাহর কৌশল গ্রহণ সম্পর্কে কোনো কিছুই জানতে পারল না। কারণ আল্লাহ তাআলা বিরোধীদের মধ্য থেকে একজনকে হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের আকৃতি দান করলেন আর হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে আকাশে উঠিয়ে নিলেন। এতে তিনি বিপদমুক্ত হয়ে যান। আর রূপান্তরিত ইয়াহুদিকে শুলে চড়ানো হয়। ইয়াহুদিরা আজন পর্যন্ত এ গোপন কৌশলের কথা জানতেই পারেনি। প্রতিরোধের সামর্থ্য হওয়া তো দূরের কথা)
আল্লাহ তাআলা শ্রেষ্ঠ কুশলী। (কারণ অন্যদের কৌশল দুর্বল ও মন্দ এবং অস্থানেও প্রয়োগ হয়ে থাকে। কিন্তু আল্লাহর কৌশল মজবুত, উত্তম ও হেকমত অনুযায়ী হয়। আল্লাহ তাআলা এ কৌশলই তখন অবলম্বন করলেন।
আর স্মরণ কর সে সময়ের কথা, যখন তিনি (গ্রেফতারের সময় ঈসা আলাইহিস সালামকে কিছুটা উদ্বিগ্ন দেখে) বললেন, হে ঈসা! (চিন্তা কর না), নিশ্চয়ই আমি তোমাকে (প্রতিশ্রুত সময়ে স্বাভাবিক পন্থায়) মৃত্যুদান করব।(সুতরাং স্বাভাবিক মৃত্যুই যখন তোমার বিধিলিপি, তখন নিশ্চিতই শত্রুর হাতে শূলে নিহত হওয়া থেকে তুমি নিরাপদ থাকবে। আপাতত) আমি তোমাকে (উর্ধ্বলোকের দিকে) উঠিয়ে নেব, তোমাকে অবিশ্বাসীদের অপবাদ থেকে পবিত্র করব এবং যারা তোমার অনুসরণ করবে, তাদের কেয়ামত পর্যন্ত অবিশ্বাসীদের উপর বিজয়ী রাখব। (যদিও বর্তমানে অবিশ্বাসীরাই প্রবল ও শক্তিশালী)
অতপর (যখন কেয়ামত আসবে, তখন দুনিয়া ও বরজাখ থেকে) আমার দিকেই ফিরে আসবে। আমি (তখন) তোমাদের (সবার) মধ্যে (কার্যত) ওই সব বিষয়ে মীমাংসা করে দেব, যাতে তোমরা পরস্পর মতবিরোধ করতে (তন্মধ্যে ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারটি অন্যতম)। (মারেফুল কুরআন)
আয়াত নাজিল সম্পর্কে ধারণাহজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু এ আয়াতে ব্যাখ্যায় বলেন, ‘ইয়াহুদিরা যখন হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে নির্যাতন ও হত্যা করতে উদ্যত হয়, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর সান্ত্বনার জন্য দুটি কথা বলেন-- আপনার মৃত্যু তাদের হাতে হত্যার আকারে হবে না বরং স্বাভাবিক মৃত্যুর আকারে হবে।- আপাতত তাদের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য আপনাকে নিজের কাছে উঠিয়ে নেব।’
দুররে মানসুরের বর্ণনায় হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু বলেন, আমি আপনাকে নিজের কাছে উঠিয়ে নেব এবং শেষ জামানায় স্বাভাবিক মৃত্যু দান করব।
এ আয়াত থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তাআলা তার বিরোধিদের হাত থেকে রক্ষার্থে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন। আসমানে এ উঠিয়ে নেয়ার বিষয়টি চিরস্থায়ীভাবে নয়, বরং কিছু দিনের জন্য।
নির্ধারিত সময়ে তিনি আবারও দুনিয়াতে আসবেন, শত্রুদের পরাজিত করবেন এবং অবশেষে স্বাভাবিক মৃত্যু দান করবেন।
হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের পুনরায় আগমনের ফলে যে বিষয়গুলো সুস্পষ্ট হবে তাহলো-০ আসমান থেকে পুনরায় হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের আগমন এবং ইসলামের শত্রুদের বিপক্ষে বিজয় লাভ অতপর স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ হবে তাঁর বিশেষ মুজেজা।
০ আসমান থেকে আগমন এবং স্বাভাবিক মৃত্যুর মাধ্যমে তাঁর যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা পূর্ণতা লাভ করবে।০ খ্রিস্টানরা হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহর পুত্র হিসেবে উপাস্য বলে ইবাদত করে বা মানে তা ভ্রান্ত হিসেবে খণ্ডণ হবে।
মহান আল্লাহর কৌশল গ্রহণ, হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে আসমানে উঠিয়ে নেয়া, আবার দুনিয়া পাঠানো ও স্বাভাবিক মৃত্যুর বর্ণনা; এ সবই বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তের সত্যয়ন।
শেষ কথা
তাই আমাদের পাপের বোঝা কাঁধে নিয়ে তিনি ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন এটা তারই দোশমন ইহুদীদের পরিকল্পিত মিথ্যাচার।
যেহেতু তাকে আসমানে জীবিত উঠিয়ে নেয়া হয়েছে,তিনি আবারো আগমন করবেন এবং যথারীতি মৃত্যু বরণ করবেন, সেহেতু মৃত্যু জয় করে কবর থেকে উঠার বিষয়টি পরিকল্পিত ভাবে আরেক মিথ্যাচার।
বাইবেলের কোথাও দাবি করা হয়নি যে তিনি ঈশ্বর, বরং ঈশ্বরের দূত হিসাবেই প্রচার করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনেও আল্লাহর নবী ( ঈশ্বরের দূত) হিসাবে আমাদের পরিপূর্ণ ঈমানের অংশ।
খ্রিষ্টান এবং মুসলমান উভয় পক্ষ নবী ঈসা আঃ এর আল্লাহর পবিত্র নবী এবং কুমারী মা মরিয়মের পবিত্র সন্তান হওয়ার বিষয় কোন রকম সংশয় না থাকলেও ঝামেলা বেঁধেছে মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে।
পবিত্র কোরআন এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ভাবে সকল ভ্রান্তির অবসান ঘটিয়ে দিয়েছেন।
নাস্তিকের সাথে এ বিষয়ে তর্ক করা সময়ের অপচয় বটে, কিন্তু ধর্ম বিশ্বাসী লোকেরা কিভাবে ঈসা আঃ এর উর্ধ্বোরোহন ও মৃত্যুর বিষয়টি কোরআনের আলোকে আকলী দলিল দিয়ে এড়িয়ে যান?
পক্ষান্তরে এটা ইহুদীদের মতবাদকে প্রতিষ্টিত করা নয়কি?
যে আল্লাহ পিতা ছাড়া সন্তান দিতে পারেন, সে আল্লাহ কি তাকে আকাশে তুলে নিতে পারেন না?
যে আল্লাহ আসমান জমিন, পাহাড় সাগর,গ্রহ নক্ষত্র পরিচালনা করেন, সে আল্লাহ কি বয়সের ঘড়ি থামিয়ে দিতে পারেন না?
একজন নবীর শানে কোরআনে বর্ণিত সম্মানজনক ঘটনা এড়িয়ে সে নবীর দুষমনদের ছাড়িয়ে দেয়া মিথ্যাচারকে নিজেদের ধর্মমত হিসাবে গ্রহন করা নিঃসন্দেহে বোকামীর লক্ষন।

No comments