হিন্দু ধর্ম ও হিন্দুত্ববাদ।
হিন্দু ধর্ম ও হিন্দুত্ববাদ।
হিন্দু ধর্ম,
হিন্দুদের জন্য হিন্দুধর্ম একটি প্রাচীন জীবনধারা। একারণে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা "প্রচলিত" রূপকে সনাতন ধর্ম বলে উল্লেখ করেন, যার অর্থ "চিরন্তন নীতি" বা "চিরন্তন পথ"।
হাজার বছর ধরে বহু বিবর্তন ও পরিবর্তনের পর বর্তমান যে রূপ, সেটাকে আমি " প্রচলিত " বুঝিয়েছি, এটাকে সনাতন বলা যায় কিনা সেটা অন্য বিষয়, অবশ্য সমস্টিক অর্থে হিন্দু ধর্ম সবচেয়ে পুরনো ধর্ম, মজার ব্যাপার হল এই ধর্মের প্রবর্তক নেই, মানে কেউ আনেনি বা প্রবর্তন করেনি, বরং
হিন্দুধর্ম বিভিন্ন ভারতীয় সংস্কৃতি ও প্রথার সংমিশ্রণে গড়ে উঠা একটি ধর্ম, এই সকল প্রথা ও ধর্ম হিসাবে সনাতনীদের শিকড়ও বৈচিত্র্যপূর্ণ।
হিন্দুরা মনে করে যে হিন্দুধর্ম হাজার হাজার বছরের পুরোনো। পুরাণ অনুযায়ী, মহাভারত, রামায়ণ এবং পুরাণে বর্ণিত ঘটনাগুলি ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগেই হিন্দুধর্মের সূচনার কথা কল্পনা করে।
ঐতিহাসিকভাবে সনাতন ধর্ম হিন্দুধর্মে ধর্মীয়ভাবে আরোপিত "চিরন্তন" কর্তব্যের দিকে নির্দেশ করে,
"চিরন্তন কর্তব্য" বলতে বুঝায় সততা, জীবন্ত প্রাণীর প্রতি সহিংসতা থেকে বিরত থাকা (অহিংসা), পবিত্রতা, সদিচ্ছা, দয়া, ধৈর্য, সহনশীলতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, উদারতা, এবং তপস্যা।
এই কর্তব্যগুলি হিন্দুদের শ্রেণি, জাত বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে প্রযোজ্য থাকলেও অবাক করা বিষয় হল স্বধর্মের সাথে বৈপরীত্যপূর্ণ, যার কারণে হিন্দু ধর্মে বহু জাত ও শ্রেনীতে বিভক্ত একজনের শ্রেণি বা জাত অনুযায়ী "নিজস্ব কর্তব্য" এবং জীবনের পর্যায় অনুযায়ী নির্ধারিত।
সনাতন ধর্মের ব্যাপক সংস্কার সূত্রপাত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে। এই সকল আন্দোলনে প্রাচীন উপনিষদ ও বেদান্ত শাস্ত্রের এক নূতনতর ব্যাখ্যা প্রদত্ত হয় এবং মনোযোগ দেওয়া হয় সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে।
এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে নাম চলে আসে রামকৃষ্ণ পরমহংস যোগানন্দ একজন ভারতীয় যোগী এবং গুরুর কথা, তিনি সনাতন ধর্মে সংস্কার এবং পুনর্জাগরণের নব দিগন্তের সূচনা করেছিলেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম সহ বিভিন্ন ধর্মমত অভ্যাস করেছিলেন, তিনি রোজা রাখতেন, নামাজ পড়তেন এবং উপলব্ধি করেছিলেন সকল মতই একই ঈশ্বরের পথে মানুষকে চালিত করে।
তিনি ঘোষণা করেন “যত্র জীব তত্র শিব” অর্থাৎ, যেখানেই জীবন, সেখানেই শিবের অধিষ্ঠান। “জীবে দয়া নয়, শিবজ্ঞানে জীবসেবা” – তার এই উপদেশ স্বামী বিবেকানন্দের কর্মের পাথেয় হয়েছিল,তার মত মহৎপ্রাণ ব্যাক্তি গড়ে উঠেছিল।
একবিংশ শতাব্দীর পর থেকে হিন্দুধর্মের মৌলিক যে নীতি গুলো পাওয়া যায় তা হল " সব ধর্মই নদীর মত, যা সব বিশ্বাসী মনকে নদীর মত বয়ে নিয়ে সেই মহান সৃষ্টিকর্তার মহাসাগরে নিয়ে ফেলে"
" তুমি কোন কোন পথে যাচ্ছো তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে মঞ্জিলে পৌছাচ্ছো কিনা"
অহিংসা, জীবে দয়া,সৃষ্টির সেবা করে মঞ্জিলে পৌছাতে হবে।
হিন্দু ধর্ম শান্তি, সহনশীলতা, উদারতা ও নানা ধর্মমতের প্রতি প্রবল শ্রদ্ধার উপর প্রতিষ্টিত।
হিন্দুত্ববাদ,
হিন্দুত্ব শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন ধর্মকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবর্তক চন্দ্রনাথ বসু। ১৮৯০ সালের দিকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের সংগ্রামের সময়টাতে ধারণাটি আলোচনায় আসে,
তবে এটি জনপ্রিয়তা পায় আরো দুই দশক পরে, উপনিবেশ-বিরোধী রাজনীতিবিদ বিনায়ক দামোদর সাভারকারের হাত ধরে। সাভারকারকে হিন্দুত্ববাদী আদর্শের জনক হিসেবেও দেখা হয়।
হিন্দুত্ববাদ একটি পুরোপুরি ফ্যাসিবাদী আন্দোলন,তাদের নীতি ও আদর্শ হল হিন্দু ধর্ম সকল ধর্মের সেরা ধর্ম, বাদ বাকি ধর্ম কর্মের অস্থিত্ব স্বীকার করে না, হিন্দুত্ববাদের মূলমন্ত্র জয় শ্রীরাম, রামের নামে ভিন্ন ধর্মের উপর জোর জুলুমের একচ্ছত্র অধিকার দিয়ে রেখেছে হিন্দুত্ববাদ।
রাজনৈতিক ভাবে তারা ভারত,বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে আলাদাভাবে মানতে রাজি নয়, অখন্ড ভারত রামের জন্মভূমি, তাই ভারতের অখন্ডতাকে পুনর্গঠন করতে তারা সব সময় সরব ও সোচ্চার।
তাদের মতে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের মুসলমানদের আদি ধর্ম হিন্দু, তাই ফিরতে হবে হিন্দু ধর্মেই।
ভারতের রাজনীতিতে এই ডানপন্থী কট্টর হিন্দুত্ববাদী আন্দোলন এতটাই বিস্তার লাভ করেছে যে, বর্তমান ভারতের রাজনীতিতে তারা নিয়ন্ত্রণ করে।
রাস্ট্র ক্ষমতায় বসিয়েছে আর এসএসের ক্যাডার, গুজরাটের কসাইখ্যাত নরেন্দ্র মোদিকে, বিশ্বব্যাপী হিন্দুত্ববাদ ছাড়িয়ে দিতে তিনি কাজ করে যাচ্ছে,
RSS কি?
ব্রিটিশ আন্দোলনের সময় গুলোতে কট্টর হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনের জন্য রাস্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ সংক্ষেপে RSS সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। এর প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেজেওয়ার একজন সাভারকারের দ্বারা প্রভাবিত শিষ্য, অখন্ড ভারত এবং তামাম বাসিন্দাকে হিন্দু ধর্মে ফেরাতে আন্দোলন করে,তাদের উগ্রতা ও সহিংসতা একসময় এতটাই প্রকট হয়ে দাড়ায় যে,স্বয়ং হিন্দুধর্মের জন্যই হুমকি হয়ে দাড়ায় তারা,
ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে তিনবার নিষিদ্ধ করা হয় সংগঠনটিকে। প্রথমবার ১৯৪৮ সালে, প্রাক্তন আরএসএস সদস্য নাথুরাম গডসের হাতে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী নিহত হওয়ার পর।
তারপর আবার ১৯৭৫ সালে, যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করেন। সেসময় প্রায় সব বিরোধী নেতাকে কারাবরণ করতে হয়েছিল।
আরএসএসকে তৃতীয়বারের মতো নিষিদ্ধ করা হয় ১৯৯২ সালে। সে বছর কট্টর হিন্দু সংগঠনগুলো ষোড়শ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত বাবরি মসজিদটি ভাঙে, সব চাপিয়ে আরএসএস এক সময় ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে, আরএসএস থেকে রাজনৈতিক শাখা হিসাবে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)র জন্ম হয়। তৃণমুল পর্যায়ে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব দুটোই আছে তাদের। ভারতের ক্ষমতায় এখন বিজেপি,
আট বছর বয়স থেকে আরএসএসের সাথে যুক্ত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
তার ক্ষমতায় আরোহণের পর থেকেই দলটি হিন্দুত্ববাদ জোরেশোরে সামনে নিয়ে আসতে শুরু করে।
অখন্ড ভারত প্রতিষ্টা,মুসলমানদের হিন্দু ধর্মে ফেরানো অথবা অখণ্ড ভারত ত্যাগে বাধ্য করার ব্যাপারে তাদের অবস্থান একেবারেই অনড়,
নরেন্দ্র মোদি হয়ে উঠেছেন বিশ্বব্যাপী হিন্দুত্ববাদের মুখপাত্র।
বাংলাদেশে আওয়ামীলীগে আমলে সরকারি সহায়তায় সনাতনীদের মাঝে ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে হিন্দুত্ববাদ,এনজিওর নামে নিবন্ধন করে ইসকন, বিদ্যানন্দসহ বেশকিছু কভার এজেন্সি ব্যাপকভাবে সনাতনীদের মাঝে ছড়িয়েছে হিন্দুত্ববাদের বীজ, বলতে গেলে সনাতনীদের নতুন প্রজন্ম পুরোটাই হিন্দুত্ববাদী ধ্যান ধারনায় গড়ে উঠেছে,তারা জানে না হিন্দু ধর্ম হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী উদারনৈতিক সহনশীল একটি ধর্ম।
হিন্দুত্ববাদের ভয়াল বিষবাস্প বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে,
ফুটনোটঃ হিন্দুত্ববাদের ধ্যান ধারণা থেকে মুজিববাদের জন্ম
বিগত ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনা ভারতের হিন্দুত্ববাদের ফ্যাসিবাদী ধ্যান ধারনাকে কপি করে মুজিববাদ প্রতিষ্টায় স্বর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল।
বাংলাদেশের মানুষ মুজিববাদ ও হাসিনাকে সমূলে উৎখাত করেছে।

No comments