মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী: বাংলাদেশের প্রকৃত জাতিরজনক ও লাল মাওলানা
মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী: বাংলাদেশের প্রকৃত জাতিরজনক ও লাল মাওলানা
জাতির জনক বলতে যদি কাউকে সম্মান জানাতে হয়, তবে নির্দ্বিধায় বলা উচিত মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে। শুধু একটি জাতির স্বপ্ন এবং মানচিত্রের জন্য আজীবন লড়াই করা এই বিস্মৃত মহান নেতা বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত পথপ্রদর্শক। মাওলানা ভাসানীর জীবনে দুটি দিক ছিল: ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি একজন মুসলমান, পীরানে পীর, আর রাজনৈতিক বিশ্বাসে একজন সমাজতন্ত্রী। এ কারণেই সমাজতন্ত্রী, গণতন্ত্রী, মাওবাদী এবং কমিউনিস্টদের কাছে তিনি সম্মানীয় "লাল মাওলানা"।
ভাসানীর রাজনৈতিক আদর্শ এবং ধর্মীয় দর্শন সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে যায়। তাকে কোনো সাধারণ মানদণ্ডে মাপা সম্ভব নয়। এপার বাংলা ওপার বাংলার মানুষের কাছে তিনি যেমন একজন কিংবদন্তি ধর্মীয় নেতা ছিলেন, তেমনি সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বব্যাপী প্রভাবশালী ছিলেন।
স্বাধীনতার ঘোষণার ঐতিহাসিক ভূমিকা
মাওলানা ভাসানীই সর্বপ্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তবে তিনি কেবল বাংলাদেশের স্বাধীনতা নয়, পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতার ঘোষণাই দেন। ভাসানী বর্তমান বাংলাদেশের মানচিত্রকে পূর্ণাঙ্গ বাংলাদেশ হিসেবে মানতে নারাজ ছিলেন। আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং পশ্চিমবঙ্গকেও বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত বলে স্বপ্ন দেখতেন। এতে করে তিনি পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারতেরও শত্রুতে পরিণত হন। তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন, ভারত ছিল অস্বস্তির মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত তাকে নজরবন্দী করে রেখেছিল এবং স্বাধীন বাংলাদেশে তাকে গৃহবন্দী অবস্থায় রাখা হয়।
মাওলানা ভাসানীর ১৮ জন সেক্রেটারির মধ্যে একজন ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি তার প্রতিষ্ঠিত দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তথাপি, উপমহাদেশের অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, শেখ মুজিবের আঁতাত এবং ক্ষমতার মোহ তাকে থার্ট ক্লাস থেকে "চান্স লিডার" পরিণত করে তোলে।
ভাসানী শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন ত্যাগ করে দ্রুত বাংলার স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। শেখ মুজিব কখনো স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়ে পাকিস্তানের আস্থা ধরে রেখেছিলেন। সেই “অখ্যাত” মেজর জিয়ার ঘোষণায় উদ্বুদ্ধ হয়েই বাঙালি জাতি স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যায়।
মুজিব ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। "আস্থা" র জায়গা ধরে রেখেছিলেন।
শুধু বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন তার গুরু ভাসানী ও দেশের অপমর জনসাধারণের সাথে...
ভাসানীর চমকপ্রদ বৈশ্বিক পরিচিতি
মাওলানা ভাসানী শুধুমাত্র অবিভক্ত বাংলার কৃষক-শ্রমিক জনতার কণ্ঠস্বর ছিলেন না; তিনি বিশ্বব্যাপী অধিকার বঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামী নেতা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী বিশ্ব মোড়লদের কাছে তিনি "ভায়োলেন্স অফ প্রফেট" হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পাক-ভারত শক্তির কাছে "বিপজ্জনক" ব্যক্তি হিসেবে তিনি অপ্রিয় ছিলেন, কিন্তু বিশ্বের অধিকার বঞ্চিত জনগণের কাছে তিনি ছিলেন মুক্তির নতুন "বার্তাবাহক"।
এপার ওপার বাংলার মানুষ তাকে জানতেন "পীরানে পীর" এবং "ভাসানচরের পীর" হিসেবে। তার পানিপড়া, তেলপড়া, ঝাড়ফুঁকে যে কোনো জটিল রোগ নিরাময় হয়ে যেত বলে বিশ্বাস ছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে। এমনকি তার দাড়ি পবিত্র কোরআন শরীফেও পাওয়া গেছে বলে বাংলাজুড়ে গুজব ছড়ায়, যা ছিল এক প্রকার অলৌকিক বিস্ময়।
ভাসানী এক জায়গায় স্থির থাকতে পারতেন না, চষে বেড়াতেন পুরো বাংলা, তার কাছে বাংলা অবিভক্ত ছিল, কোন সীমানা প্রাচীর তাকে আবদ্ধ করতে পারতেন না,
ভাসানী কোথাও গেলে বাতাসে বিদ্যুৎ গতিতে খবর ছাড়িয়ে পড়ত,ঝাঁকে ঝাঁকে তরুন যুবক আবাল বৃদ্ধ বনিতা পথে নেমে আসত,
ভাসানচরের দেও দানবের শাসক,দাদী নানীর মুখে শোনা জিন্দা পীরকে এক নজর দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত মানুষ, হাতে থাকত পানির বোতল ও তেলের ভান্ড।
বর্তমান প্রজন্মের অজ্ঞতা ও ভাসানীর ইতিহাসের বিকৃতি
পরিকল্পিতভাবে মাওলানা ভাসানীর ইতিহাস মুছে ফেলার কারণে আজকের ৬৫% তরুণ প্রজন্ম হয়তো তার নাম শুনেছে, কিছু স্লোক এবং উক্তি জানে; কিন্তু তার প্রকৃত দর্শন এবং রাজনৈতিক আদর্শ সম্পর্কে জানে না। তার সংগ্রামী জীবন, অবদান এবং অনন্য রাজনৈতিক দর্শন জানার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম জাতির সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানার জন্য ধারাবাহিক অনুসন্ধান কলাম লেখার নিয়ত করেছি...
মাওলানা ভাসানী শুধু অবিভক্ত বাংলার কৃষক-শ্রমিক মেহনতি জনতার কণ্ঠস্বরই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সারা বিশ্বের শ্রমজীবী, অধিকার বঞ্চিত মানুষের সংগ্রামের মহানায়ক। তার মত বহুগুণে গুণান্বিত একজন মানুষ বাংলার মাটিতে আর কখনো জন্ম নেবে কিনা জানা নেই।
মাওলানার সংগ্রাম ও অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চোখ রাখুন...

No comments