Header Ads

জহির রায়হান: মেধাশূন্য বাংলাদেশের এক অমূল্য রত্ন

 জহির রায়হান: মেধাশূন্য বাংলাদেশের এক অমূল্য রত্ন




সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ যখন মেধাশূন্যতায় ভুগছিল, তখন অন্যতম একজন প্রতিভাবান যিনি দেশকে ঋণী করে গেছেন, তিনি হলেন জহির রায়হান। দেশভাগের পর ১৯৪৬ সালে তিনি বাংলাদেশে শুরু হওয়া যেকোনো আন্দোলনে সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় নেতা ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে যে ১০ জন প্রথম কারফিউ ভেঙে পথে নেমেছিলেন, তাদের একজন ছিলেন জহির রায়হান। 

জহির রায়হান: চলচ্চিত্র নির্মাণের পথিকৃৎ

জহির রায়হান নাট্যকর্ম ও চলচ্চিত্রের প্রতি গভীর আকর্ষণ থেকে বাংলা সিনেমার সূচনাতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বাংলা চলচ্চিত্র জগতে কিংবদন্তী খ্যাতি অর্জন করেন এবং বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক মিলিয়ে মোট ১২টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। 

 উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র:

1. জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০)  

   – ভাষা আন্দোলন এবং সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে নির্মিত, যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক মাইলফলক।

2. স্টপ জেনোসাইড (১৯৭১)  

   – মুক্তিযুদ্ধের উপর ভিত্তি করে নির্মিত তথ্যচিত্র, যেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচার এবং গণহত্যার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। 

3. কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩)  

   – মানুষের মানসিক সংকট ও সামাজিক বৈষম্যের উপর নির্মিত চলচ্চিত্র। 

4. সঙ্গম (১৯৬৪)  

   – প্রেম ও সম্পর্কের জটিলতাকে উপজীব্য করে নির্মিত একটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র।

5. বাহানা (১৯৬৫)  

   – সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যার উপর নির্মিত। 

6. অনেক দিন পরে (১৯৬৪)  

   – সামাজিক সমস্যাবলি এবং মানবিক সংকটের উপর নির্মিত। 

7.  বেহুলা (১৯৬৬)  

   – লখিন্দর ও বেহুলার পৌরাণিক প্রেম কাহিনী নিয়ে নির্মিত। 

8. সোনার কাজল (১৯৬২)  

   – গ্রামীণ জীবনের আবেগ এবং ভালোবাসার কাহিনী ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। 

9. জ্বলতে সুরুজ কি নিচে (১৯৬৫)  

   – উর্দু ভাষায় নির্মিত একটি চলচ্চিত্র, যা পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয়েছিল। 

 মুক্তিযুদ্ধে জহির রায়হানের অবদান:

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জহির রায়হান কলকাতায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারাভিযান চালান এবং তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। তিনি তার বিখ্যাত তথ্যচিত্র **"স্টপ জেনোসাইড"** নির্মাণ করেন, যা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তার এই তথ্যচিত্র উন্মোচনকালে উপস্থিত ছিলেন মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা।

নিজের অর্থনৈতিক দুরবস্থা থাকা সত্ত্বেও, তিনি মুক্তিযুদ্ধের জন্য তার চলচ্চিত্র থেকে প্রাপ্ত সমস্ত অর্থ দান করেছিলেন। ১৯৭০ সালে ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে নির্মিত **"জীবন থেকে নেয়া"** দেশ এবং বিদেশে বিপুল সাড়া ফেলেছিল।

 সাহিত্য কর্ম:

জহির রায়হান একাধারে ছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা, কবি, ঔপন্যাসিক, এবং সমাজকর্মী। তার অসাধারণ উপন্যাসগুলো বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তার অন্যতম বিখ্যাত উপন্যাস "হাজার বছর ধরে"। 

 উল্লেখযোগ্য বই:

1. হাজার বছর ধরে 
2. আর কত দিন
3. বরফ গলা নদী
4. শেষ বিকেলের মেয়ে
5. আরেক ফাল্গুন  
6. সময় অতিবাহিত হচ্ছে  
7. একুশের গল্প  
8. নয়ন তারা
9. একজন আদম  
10.উত্তর আধুনিক কবিতা  
11.কাচের দেয়াল 
12.সাংস্কৃতিক চেতনা ও শিল্পী জীবন  

 একটি অমীমাংসিত রহস্য:

জহির রায়হানের জীবন ছিল বহুমুখী প্রতিভার প্রতিচ্ছবি। তবে তার জীবনের অপ্রত্যাশিত অন্তর্ধান আজও এক অমীমাংসিত রহস্য রয়ে গেছে। তিনি দেশকে যে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধ করেছিলেন, তা আজও অনুপ্রেরণার উৎস।

 যে রহস্য আজো অনাবৃত


“৩০ জানুয়ারি জহির রায়হান একটি ফোন পেয়ে মিরপুরে ছুটে গিয়েছিলেন। একথা বহুবার লেখা হয়েছে, বলা হয়েছে। কিন্তু বলা হয়নি সেলিমের কথা। সেলিমও নাকি সেরকমই একটি ফোন পেয়ে প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদকে না বলেই জহির রায়হানের সঙ্গে মিরপুরে ছুটে গিয়েছিলেন। তারপর দু’জনের ভাগ্যে একই নিষ্ঠুর পরিণতি। দু’জনই নিখোঁজ। সেলিমের মা এ সংবাদ পেয়ে প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ চৌধুরীর কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। সেলিম বঙ্গভবনের যে ঘরটিতে থাকতেন, ইত্যবসরে সে ঘর থেকে সমস্ত কাগজপত্র, কাপড়-চোপড় উধাও। শহীদ সেলিমের মা অনেক কষ্ট করেও কোনো রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেননি। রহস্য রহস্যই থেকে গেল।

জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর বুদ্ধিজীবী হত্যার কোনো কাগজপত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। কাগজগুলোর কোনো হদিসই পাওয়া গেল না। পাওয়া গেলে হয়তো পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির অন্য কেউ কাজে লাগাতে পারতেন। শহীদ সেলিমের মায়ের মতে, বঙ্গভবনের তার ঘর থেকে যে প্রয়োজনীয় কাগজগুলো উধাও হয়েছিল, সেগুলো সম্ভবত তদন্ত কমিটির গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রই হবে। খোদ বঙ্গভবন থেকে জিনিসপত্র উধাও হয়ে যাবে তা ভাবতেও বিশ্বাস হয় না।

শহীদ সেলিম বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তের কাজে সরাসরি জড়িত ছিলেন একথা আমি আগে জানতাম না। আমি কেন, আর কেউ জানে কিনা তাও জানি না। জহির রায়হান ও সেলিমের নিখোঁজ রহস্য এখন আমার কাছে আরও রহস্যজনক বলে মনে হচ্ছে। বুদ্ধিজীবী হত্যা যেমন ৭১ সালে গুরুত্বের সঙ্গে উদঘাটিত হয়নি, তেমনি জহির রায়হান নিখোঁজ রহস্যও গুরুত্বের সঙ্গে উদঘাটন করার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেনি। অথচ এটা একটা গভীর ষড়যন্ত্র। যে ষড়যন্ত্রের বিষবৃক্ষের বীজ রোপণ হয়েছিল সেদিন।”

পান্না কায়সার নিজেই বলেছেন যে, খোদ বঙ্গভবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র উধাও হয়ে যাবে সেটা ভাবনারও অতীত। জহির রায়হানের সাথে লেফটেন্যান্ট সেলিমও বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এ সম্পর্কিত কাগজপত্র জহির রায়হান এবং সেলিম উভয়ের কাছ থেকেই উধাও হয়ে গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রেসিডেন্টের ভবন থেকে কাগজপত্র উধাও করতে পারে কারা? ‘রাজাকার’ বা ‘পাকিস্তানপন্থীরা’ অবশ্যই নয়। এটা করা সম্ভব একমাত্র তাদের পক্ষে, যারা ক্ষমতার আশপাশে ছিলেন।

এখানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবকে উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে। তিনি জহিরের বড় বোন নাসিমা কবিরকে ডেকে নিয়ে বলেন, "জহিরের নিখোঁজ নিয়ে এ রকম চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে।" পরে থেকে নাসিমা নীরব হয়ে যান।

তাহলে কি আমরা ধরে নিতে পারি শেখ মুজিবের যোগসাজশে ভারতীয় বাহিনী তাকে গুম অতঃপর খুন করেছিলেন?

জহির রায়হানের গুম ও খুনের পিছনে যে সব কারণ থাকতে পারে


মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করার পর আওয়ামী লীগ নেতারা কলকাতায় পালিয়ে গিয়েছিলেন। ৯ মাস ধরে তারা নারীর সাথে মত্ত ও মদ্যপান করছিলেন, আর এই সময়ে জহির রায়হান তাদের কর্মকাণ্ডের নীরব সাক্ষী ছিলেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট সংগ্রহ করেছিলেন। স্বাধীনতার পর, ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে জহির এমন কিছু তথ্য সংগ্রহ করেন যা কিছু ক্ষমতাধর ব্যক্তির জন্য বিপজ্জনক ছিল।

অতঃপর, স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নেতাদের ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা এবং ভারতীয় বাহিনীর লুটপাটের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে, জহির মাওলানা ভাসানীর আপোষহীন রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়েন। এর ফলে আওয়ামী লীগ সরকার জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া ধামাচাপা দেয় এবং এর পিছনে তাদের স্বার্থ থাকা বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ রাখে না। যদিও বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য পাকিস্তানিদের দোষারোপ করা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে এই হত্যাকাণ্ডটি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র' দ্বারা পরিকল্পিত হয়েছিল।

জহির রায়হানকে সরিয়ে ফেলার প্রয়োজনীয়তার কারণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন এবং তার শত্রুরা জানতো যে এসব তথ্য তাদের স্বার্থে বিপজ্জনক। বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্তের জন্য যে তথ্য তার কাছে ছিল তা অনেক মহলকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছিল। 

জহির রায়হানের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, বিশিষ্ট অভিনেত্রী ববিতা, এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন যে, যুদ্ধের সময়ে জহির একাধিকবার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস করার হুমকি দিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর, জহির দেশে ফিরে এসে নিজের বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নিহত হওয়া জানার পর অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। তিনি প্রায় পাগলের মতো হয়ে তাঁর ভাইকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন। এক সময় তাকে বলা হয় যে, বড় ভাই মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনে রয়েছেন এবং খুব অসহায় অবস্থায় আছেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে, জহির মিরপুরে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান 

জহির রায়হান এবং রাষ্ট্রপতির সহকারী আবু সায়িদ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর, তাদের সাথে সম্পর্কিত প্রমাণ্য দলিলও অদৃশ্য হয়ে যায়। এই ঘটনার পেছনে শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগ সরকারের ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা তাদের শাসনামলে গুম এবং খুনের সংস্কৃতির ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে।

এইভাবে, জহির রায়হানের গুম ও খুনের পেছনে রাজনৈতিক, সামরিক, এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্তে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের অন্তর্লীন সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট ষড়যন্ত্রের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ওঠে আসে।

No comments

Powered by Blogger.