বখতিয়ার খিলজির বিজয় এবং বাংলাদেশ নামকরণের ইতিহাস
বখতিয়ার খিলজির বিজয় এবং বাংলাদেশ নামকরণের ইতিহাস
১১২০-৬ সালের এক ভোরে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি নদীয়া আক্রমণ করেন। লক্ষ্মণ সেনের ধারণা ছিল, ঝাড়খণ্ডের শ্বাপদসংকুল অরণ্য দিয়ে কোনো সৈন্যবাহিনীর পক্ষে নদীয়া আক্রমণ করা সম্ভব নয়। সেই ধারণাকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে, দুর্ধর্ষ সমরযোদ্ধা বখতিয়ার খিলজি সেই পথেই তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে নদীয়ায় প্রবেশ করেন। অভিযানের সময় ঝাড়খণ্ডের মধ্য দিয়ে এত দ্রুত গতিতে অগ্রসর হয়েছিলেন যে মাত্র ১৭ জন সৈনিক তাকে অনুসরণ করতে পেরেছিল।
এদিকে লক্ষ্মণ সেন মধ্যাহ্ন ভোজে ব্যস্ত ছিলেন এবং দুর্গের রক্ষীরাও অপ্রস্তুত অবস্থায় ছিল। এমন এক সুবর্ণ সুযোগে বখতিয়ার খিলজি আক্রমণে দেরি করলেন না। তার সৈন্যদের মধ্যে অস্ত্রের সংকট ছিল, তাই বখতিয়ার তাদের মহানবী (সা.) এর একটি হাদিস শোনান, যাতে বলা হয়েছিল, "আমার একদল মুজাহিদ লড়াই করবে, যাদের কাছে অস্ত্র থাকবে না, কিন্তু আল্লাহর নামে ধ্বনি দিয়ে বিজয়ী হবে।" এরপর বখতিয়ার তার সৈন্যদের "বাঙ্গে আল্লাহ" বলে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। ফার্সি ভাষায় "বাঙ্গ" শব্দের অর্থ হলো নারা বা ধ্বনি।
এই ১৭ জন মুজাহিদ নারায়ে তাকবির স্লোগান দিয়ে লক্ষ্মণ সেনের দিকে অগ্রসর হলে সেন তার লোকজন নিয়ে পালিয়ে যান। বিনা রক্তপাতে নদীয়া তথা বাংলার দখল নেন বখতিয়ার খিলজি এবং সেখানে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলামের সুশাসন ও সৌন্দর্য দেখে হাজার হাজার হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ইসলাম গ্রহণ করেন। তখনই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে "বাঙ্গলাহদেশ," অর্থাৎ আল্লাহর নামে ধ্বনি দিয়ে বিজয়ী হওয়া দেশ। যদিও ঐতিহাসিক সূত্রে এই তথ্যের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবে ঢাকার অদূরে খননকৃত সুলতানি আমলের রৌপ্য মুদ্রায় "বঙ্গের রাজস্ব হতে" লেখা রয়েছে।
বাংলাদেশ শব্দের সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক বিবর্তন:
ইতিহাসবিদ সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের মতে, মুসলিম শাসনামলে, বিশেষ করে ১৩৩৬ থেকে ১৫৭৬ সাল পর্যন্ত সুলতানি আমলে, এবং মুঘলদের দখলের পর বাংলা অঞ্চলটি 'বাঙাল' বা 'বাঙালাহ' নামে পরিচিত হয়। আর্যরা এই অঞ্চলকে 'বঙ্গ' নামে ডাকত। বাংলা শব্দের উৎপত্তি সংস্কৃত শব্দ 'বঙ্গ' থেকে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজা তাদের দখলদারিত্বের সময় এই বাংলাকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করেছেন।
উনিশ শতকের সাহিত্যেও 'বাংলাদেশ' শব্দটি পাওয়া যায়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে লেখা 'স্বদেশ' পর্যায়ের একটি গানে বলেন, "আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!" এমনকি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্যারীচাঁদ মিত্র, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনাতেও 'বঙ্গদেশ' হিসেবে 'বাংলাদেশ' শব্দটি পাওয়া যায়।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও তার 'বনগীতি' গ্রন্থে একটি গানে লেখেন, "নমঃ নমঃ নমো বাঙলাদেশ মম চির মনোরম চির মধুর।" সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতাতেও 'বাংলাদেশ' শব্দটি এসেছে।
বাংলাদেশ শব্দের রাজনৈতিক ব্যবহার:
রাজনৈতিকভাবে 'বাংলাদেশ' শব্দের ব্যবহার সর্বপ্রথম করেছেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। যদিও তিনি বর্তমান ভূখণ্ড নয়, বরং ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গসহ অবিভক্ত বাংলাকে 'বাংলাদেশ' বলতেন। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ভাসানী বারবার পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করে 'বাংলাদেশ' প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন।
১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলন থেকে মাওলানা ভাসানী পূর্ব পাকিস্তানীদের 'আসসালামু আলাইকুম' বলে জাতিকে 'বাংলাদেশ' প্রতিষ্ঠার বীজ বপন করেছিলেন। এরপর ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে সন্তোষ কৃষক সম্মেলনে এসে ভাসানী পূর্ব পাকিস্তানীদের পাকিস্তান থেকে বিদায় হতে বলেন। এ সময় ভাসানীর জনসভাগুলো 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর' স্লোগানে মুখর ছিল।
তবে শেখ মুজিবুর রহমানের 'বঙ্গবন্ধু' খেতাব প্রাপ্তির আগেই ভাসানী 'বাংলাদেশ' শব্দটি জাতির মধ্যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মুজিব সাহেব তখনও 'ফেডারেল পাকিস্তান' এর ক্ষমতা ভাগাভাগির রাজনীতিতে ব্যস্ত ছিলেন।
অতএব, বাংলাদেশের নামকরণের ধারা এসেছে বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ বিজয়ের মধ্য দিয়ে। কবি ও সাহিত্যিকদের কবিতায় শব্দটির পূর্ণতা পায় উনিশ শতকে। মাওলানা ভাসানী ১৯৫৭ থেকে 'বাংলাদেশ' শব্দের রাজনৈতিক উত্থান ঘটান, যা ১৯৭০ সালে এসে পূর্ণতা লাভ করে।
এই সময়ে দেশের কৃষক, শ্রমিক ও মজুরেরা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ সংগ্রাম করেছে। বখতিয়ার খিলজি থেকে শুরু করে মাওলানা ভাসানী, এদের হাত ধরে বাংলাদেশের নামকরণের গর্বিত ইতিহাস আজ আমাদের সামনে প্রতীয়মান।
.png)
No comments